গাজায় হুসেইন আল-রামলাওয়ির এখন পুরোটা সময় কাটে সেই তাঁবুটিকে রক্ষা করতে, যা তাঁর পরিবারকে বিগত কয়েক দিন ধরে গাজায় আঘাত হানা গভীর নিম্নচাপের প্রলয়ঙ্করী ঝড় বৃষ্টির প্রভাব থেকে আগলে রেখেছে।
প্রচণ্ড বাতাস আর বৃষ্টিতে যা কিছু নষ্ট হয়েছে, তা মেরামতের আশায় দিনের আলোয় তিনি পাথর, তার আর নাইলনের টুকরো কুড়িয়ে বেড়ান। আর রাত নামলেই পরিবারের সবাইকে নিয়ে সজাগ থাকেন, ভেতর থেকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে থাকেন তাঁবুর খুঁটিগুলো; পাছে ঝড়ের তোড়ে সবকিছু উড়ে না যায়। তাঁদের এই দুর্ভোগের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে যুদ্ধে আহত ছেলের ভাঙা পা; তীব্র শীতে যার যন্ত্রণা অসহনীয় হয়ে ওঠে।
দুদিন আগেই রাতের আঁধারে তাঁদের তাঁবুটি ভেঙে পড়েছিল। বৃষ্টির পানি ভেতরে ঢুকে ভিজিয়ে দেয় বিছানাপত্র আর কাপড়চোপড়, হাড়কাঁপানো শীতে জবুথবু হয়ে পড়ে সবাই।
হুসেইনের স্ত্রী ওয়াফা আল-রামলাওয়ি আল জাজিরা নেটকে বলেন, “সারা রাত আমরা খুঁটিগুলো ধরে বসে থাকি, যাতে বাতাসে উড়ে না যায়। বাতাস একটু কমলে হয়তো চোখের পাতা এক করি, কিন্তু পরক্ষণেই আবার জেগে উঠতে হয়; যেন আমরা কোনো পাহারায় আছি, অদৃশ্য কোন শত্রুর আশংকায় বিনিদ্র রজনী।”
আসন্ন বিপর্যয়
গাজার সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, ডিসেম্বর মাসের শুরু থেকে আবহাওয়ার বৈরী প্রভাবে এ পর্যন্ত ২৫ জন নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে অন্তত ৬ জন শিশু মারা গেছে তীব্র শীতে।
অন্যদিকে, সরকারি মিডিয়া অফিসের মহাপরিচালক ইসমাইল আল-থাওয়াবতাহ সতর্ক করে বলেছেন, দুর্বল অবকাঠামো, প্রবল বর্ষণ আর তীব্র বাতাসের কারণে গাজা উপত্যকায় একটি বড় ধরনের “বিপর্যয়” ঘনিয়ে আসছে। সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি জানান, সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় থাকা সত্ত্বেও, সম্পদের অভাব আর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণে শীতের এই বিপদ মোকাবিলা করার মতো প্রয়োজনীয় সক্ষমতা গাজা সরকারের নেই।
দুই বছরের যুদ্ধ আর দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ঘরবাড়ি ধ্বংস হওয়ার পর উপত্যকার অধিকাংশ মানুষ এখন বসবাস করছেন তাঁবু কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে।
কাপড়ের তাঁবুর ভেতরে বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়ার পর, সালাহ আবু সাকার বাধ্য হয়ে ১০০০ শেকেল (প্রায় ৩০০ ডলার) খরচ করে নাইলনের চাদর (ত্রিপল) কিনেছেন। উদ্দেশ্য—তাঁবুর ছাদ আর চারপাশ ঢেকে দেওয়া, যাতে বিছানা আর কাপড় ভেজার সেই পুরোনো বিভীষিকা আর ফিরে না আসে।
তবে বাতাসের তীব্রতা তাঁর ধারণার বাইরে ছিল। কাপড় আর টিনের পাত দিয়ে তিনি যে সামান্য বেড়া তৈরি করেছিলেন, তা ঝড়ে দুমড়েমুচড়ে গেছে। ঝড় থামেনি, তবুও আবু সাকার দখলদারদের হামলায় ধ্বংস হওয়া বিদ্যুৎ লাইনের তার কুড়িয়ে এনে সেই বেড়া মেরামতের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আল জাজিরা কে তিনি বলেন, ‘সারা রাত আমরা জেগে থাকি। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাদের রক্ষা করেন এবং তাঁবুটি উড়ে না যায়। রাতের বেলা বাইরে গিয়ে খুঁটিগুলো শক্ত করে বাঁধি আর তাঁবু পাহারা দিই, যাতে বাতাস তা উপড়ে ফেলতে না পারে।’

সম্বলহীনতার হাহাকার
বর্তমান নিম্নচাপ শুরু হওয়ার আগেই সংবাদমাধ্যমে ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস শুনে আইয়াদ আল-ওয়াহিদি তাঁর তাঁবু রক্ষায় তৎপর হয়ে উঠেছিলেন।
তিনি প্রচুর পাথর জড়ো করে তাঁবুর চারপাশে দিয়েছিলেন, পানি ঢোকা আটকাতে বালির বাঁধের মতো তৈরি করেছিলেন, লোহার খুঁটিগুলো নতুন করে পুঁতে দড়িগুলো টান টান করে বেঁধেছিলেন। কিন্তু বাতাসের ক্ষিপ্রতা তাঁর সব প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেয়। তাঁবুর ভেতরে পানি ঢুকে পড়ে এবং শেষমেশ তাঁবু ও তার বাইরের শৌচাগারটি ধসে পড়ে।
এর ফলে নিম্নচাপ না কমা পর্যন্ত এবং তাঁবু মেরামত না হওয়া পর্যন্ত পরিবারটি ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছে। ওয়াহিদি আশ্রয় নিয়েছেন ভাইয়ের কাছে, স্ত্রী গেছেন তাঁর বাবার বাড়ি, আর সন্তানদের রাখা হয়েছে বন্ধুদের কাছে। আল জাজিরা নেটকে তিনি বলেন, ‘শীত মোকাবিলার কোনো সামর্থ্যই আমাদের নেই। এক ভয়াল রাত পার করেছি আমরা; সারা রাত খুঁটি ধরে রেখেছিলাম যাতে তাঁবু গায়ের ওপর না পড়ে, কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি—তাঁবুটি ধ্বসেই পড়ল।’
প্রথম দেখায় মোহাম্মদ সাকারের অবস্থা প্রতিবেশীদের চেয়ে কিছুটা ভালো মনে হতে পারে। কারণ তিনি তাঁবুতে নন, বরং দখলদারদের হামলায় ধ্বংসপ্রায় একটি বাড়ির নড়বড়ে কক্ষে বাস করছেন। কিন্তু বৃষ্টি আর বাতাস তাঁর মেরামতের সব কষ্ট বিফল করে দিয়েছে এবং বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
মোহাম্মদ সাকার ঘরের ছাদ ঢাকতে বেশ কিছু প্লাস্টিকের ত্রিপল কিনেছিলেন এবং ছাদহীন একটি কক্ষের ভেতর শিশুদের জন্য ছোট একটি তাঁবু টাঙিয়েছিলেন। কিন্তু সেই তাঁবুটি পুরোপুরি ধসে পড়ে, আর বৃষ্টির পানিতে ঘরের মেঝে ভেসে যায়।
পাশের একটি ধ্বংসস্তূপ থেকে পাথর এনে ঘরের নড়বড়ে ছাদ ঠিক করার সময় তিনি আল জাজিরা নেটকে বলেন, ‘আমার নিজের বাড়ি দখলদাররা ধ্বংস করেছে। এটি আমার আত্মীয়ের বাড়ি। ভেবেছিলাম এখানে নিরাপদে থাকব, কিন্তু পরিস্থিতি অত্যন্ত করুণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার স্ত্রী ঠান্ডায় অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ত্রিপল আর নাইলন দেওয়া সত্ত্বেও পানি চুইয়ে পড়ছে। বাচ্চাদের তাঁবুটি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। এসবের পেছনে অনেক খরচ হয়েছে, অথচ কোনো দাতব্য বা আন্তর্জাতিক সংস্থা আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেনি।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি যোগ করেন, ‘সব ধরনের তাঁবুই বসবাসের অযোগ্য। আমরা এমন ঘর চাই, যেখানে মানুষের মতো বেঁচে থাকা যায়।’

যৌথ যাতনা ও টিকে থাকার লড়াই
অন্যদিকে, হামিদ আবু বাইদ প্রকৃতির এই প্রতিকূলতার কাছে সহজে হার মানতে রাজি নন। আকাশচুম্বী খরচ সত্ত্বেও তিনি দমে না গিয়ে বারবার মেরামত করে চলেছেন ঝড়ে বিধ্বস্ত নিজের আশ্রয়টুকু। তাঁর ছেলে আদনানের বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল; নিজের তাঁবুর পাশেই ছেলের জন্য একটি বাড়তি তাঁবু খাটিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু বিধ্বংসী ঝড় সেটি তছনছ করে দিয়েছে।
তবে স্বপ্ন থেমে নেই। বাবা আর ছেলে মিলে এখন সেই বিধ্বস্ত তাঁবুটি মেরামতে ব্যস্ত, যাতে নিম্নচাপ শেষ হওয়ার পরপরই বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা যায়। বর আদনানের বন্ধুরা বিয়ের জন্য বেশ কিছু সরঞ্জাম দান করে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
আবু বাইদ ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িগুলো থেকে পাথর কুড়িয়ে আনছেন; সঙ্গে বালুর বস্তা, কাপড়ের টুকরো, কাঠ আর নাইলন জোগাড় করছেন। প্রায় ১৪ জন সদস্যের এই বিশাল পরিবারের আশ্রয়স্থলটি বাতাস আর বৃষ্টির ঝাপটায় বারবার তছনছ হচ্ছে, আর তিনি তা বারবার আগলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।
তিনি তাঁর স্ত্রী খাদরা আবু বাইদের দিকে ইশারা করে বলেন, বাতাসের তোড়ে তাঁবুর একটি খুঁটি তাঁর মাথায় এসে পড়েছিল যখন তিনি কাঠকয়লার আগুনে সন্তানদের জন্য রুটি সেঁকছিলেন। ‘আল্লাহ রক্ষা করেছেন,’ তিনি বলেন, ‘মাথা ফেটে গিয়েছিল, পাঁচটি সেলাই দিতে হয়েছে।’
একই সংকটে দিন কাটছে আলা আল-শামি-র। বালুময় মাটির কারণে তাঁবুর খুঁটিগুলো মাটিতে শক্ত করে গেঁথে রাখা যাচ্ছে না। ফলে বাতাস বইলেই তাঁকে সারাক্ষণ সতর্ক থাকতে হয় পাছে তাঁবুটি উড়ে না যায়। তিনি আল জাজিরা নেটকে বলেন, ‘সারা দিন আমরা খুঁটি গাঁথি আর তাঁবুর চালের ওপর ত্রিপল টানি যাতে পানি না ঢোকে। চারপাশে বালুর বাঁধ উঁচু করার চেষ্টা করি, কিন্তু বালু চুইয়ে পানি ভেতরে ঢুকেই পড়ে। সজাগ না থাকলে আমরা সপরিবারে ডুবে যাব।’
গাজার বাসিন্দারা তাদের সর্বস্ব দিয়ে তাঁবুগুলো টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও, ঝোড়ো বাতাসই জয়ী হয়েছে বেশি জায়গায়। খোলা প্রান্তরে তাকালে দেখা যায় বহু তাঁবু ধসে পড়ে আছে, যা ছেড়ে বাসিন্দারা আপাতত অন্য কোথাও আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
তরুণ মুসলেহ আল-আরুর জানান, গত রবিবার মাঝরাতে তাঁর দাদির আর্তনাদে পাড়া-প্রতিবেশীদের ঘুম ভেঙে যায়। প্রচণ্ড বাতাসে বৃদ্ধার গায়ের ওপর তাঁবুটি ধসে পড়েছিল। ভাগ্যক্রমে তিনি বড় কোনো আঘাত পাননি। মুসলেহ আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা বাতাস থেকে তাঁবু বাঁচানোর কতই না চেষ্টা করি, কিন্তু সব চেষ্টাই বৃথা যাচ্ছে।’
বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ও মানবিক আর্তনাদ
মমদুহ হামদান নামে এক ব্যক্তি জানান, গভীর রাতে ঘুমের ঘোরেই তাঁর তাঁবুটি ধসে পড়ে। এতে তিনি পিঠে মারাত্মক চোট পান, যার যন্ত্রণায় এখনো ভুগছেন।
এদিকে আহমেদ শামালির তাঁবুটি তিনি নিজেই কাঠ আর খুঁটি দিয়ে মাটির বেশ গভীরে গেঁথে তৈরি করেছিলেন। ভেবেছিলেন এটি হয়তো টিকে যাবে, কিন্তু বাতাস তাঁর সব সুরক্ষা ছিঁড়ে তছনছ করে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘রাত ৩টার দিকে হঠাৎ তাঁবুটি উল্টে যায় এবং ওপরের ত্রিপলগুলো উড়ে যায়। আমরা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াতে থাকি। প্রতিবেশীরা এসে আমাদের উদ্ধার করে। এখন তাদের ওখানেই আছি, যতক্ষণ না তাঁবুটি আবার বাসযোগ্য হয়।
গাজায় ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, চলতি নিম্নচাপ শুরু হওয়ার পর থেকে গাজা উপত্যকায় ১৮টি আবাসিক ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে, যার ফলে ব্যাপক প্রাণহানি ও বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
তিনি আরও যোগ করেন, ১১০টিরও বেশি আবাসিক ভবন মারাত্মকভাবে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া প্রচণ্ড বাতাস আর প্রবল বর্ষণে বাস্তুচ্যুত মানুষদের প্রায় ৯০ শতাংশেরও বেশি তাঁবু হয় উড়ে গেছে, নয়তো পানিতে তলিয়ে গেছে।
মাহমুদ বাসাল জানান, এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া শুরু হওয়ার পর থেকে সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরা ৭০০-রও বেশি জরুরি সাহায্যের আবেদন (SOS) পেয়েছেন। এর মধ্যে বন্যায় আটকে পড়াদের উদ্ধার থেকে শুরু করে ভবন ধসে পড়া ও অন্যান্য বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার অনুরোধ ছিল।
আল জাজিরা আরবি থেকে অনুবাদ











