সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিবর্তনের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন এক ভিন্নধর্মী নেতৃত্ব, আহমদ আশ শারা। মাঠে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, শরণার্থী ও প্রবাসজীবনের কঠিন বাস্তবতা, আর দখলীকৃত গোলানের ইতিহাস, সব মিলিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত যাত্রা যেন সিরিয়ার দীর্ঘ সংগ্রামেরই প্রতিচ্ছবি। লড়াই, হারানোর বেদনা, দেশপ্রেম ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা—এই পথ পেরোতে পেরোতেই তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের রাজনৈতিক অবস্থান।
তাঁর গল্প কেবল একজন নেতার উত্থানের বিবরণ নয়; বরং যুদ্ধ ও পুনর্গঠনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা পুরো একটি জাতির অভিজ্ঞতাকে ধারণ করে। আর এই অভিজ্ঞতারই সমন্বয় তাঁকে আজ নিয়ে এসেছে সিরিয়ার সর্বোচ্চ নেতৃত্বের আসনে।
প্রবাসজীবন, কিন্তু বুকে ছিল নিজের মাটি
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমদ আশ শারা ১৯৮২ সালে সৌদি আরবে জন্ম নেন। তাঁর পরিবার ইসরায়েল দখলীকৃত গোলান মালভূমির বাসিন্দা। শৈশব থেকেই ভূমি ও পরিচয় হারানোর বেদনা, দখলদারিত্বের বাস্তবতা—এসব তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পরবর্তীতে দামেস্কে ফিরে এলে সেই রাজনৈতিক সচেতনতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই পারিবারিক অতীত ও অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি গড়ে দেয় এবং তাঁর ব্যক্তিগত পথচলাকে সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের সংগ্রাম, আর দখলদার রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বৃহত্তর গল্পের সঙ্গে যুক্ত করে।
যুদ্ধের অভিজ্ঞতা
২০০৩ সালের মার্কিন আগ্রাসনের পর আহমদ আশ শারা ইরাকে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হন এবং খুব শুরুর দিকেই যুদ্ধ ও সংগঠনের কাজ সম্পর্কে হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ইরাকই হয়ে ওঠে তাঁর প্রথম বাস্তব পাঠশালা—গোয়েন্দা কর্মকৌশল শেখা, শক্তির মানচিত্র বোঝা, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যকার প্রতিযোগিতা, আর জোট ও মতবিরোধের সীমা কোথায়, তা বুঝে নেওয়ার জায়গা।
সুশৃঙ্খল সংগঠক
২০১১ সালে সিরিয়ায় বিপ্লব শুরু হলে আহমাদ শারা উত্তর সীমান্ত দিয়ে দেশে ফেরেন। আলেপ্পোকে তিনি নিজের কার্যক্রমের প্রধান মঞ্চ হিসেবে বেছে নেন। সেখানে ‘জাবহাতুন নুসরা’ গড়ে তুলে দ্রুতই সবচেয়ে সংগঠিত ও শৃঙ্খলাপরায়ণ মেদান কমান্ডারদের একজন হিসেবে পরিচিতি পান। স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ, কঠোর শৃঙ্খলা ও ধাপে ধাপে প্রভাব বিস্তারের ওপর ভিত্তি করে আলাদা ধরনের সামরিক কাঠামো দাঁড় করানোই ছিল তাঁর লক্ষ্য।
স্বপ্নবাজ প্রকল্প নির্মাতা
২০১৬ সালের শেষ দিকে আসাদের বাহিনী আলেপ্পো দখল করার পর আহমাদ আশ শারা উত্তরে ইদলিবে চলে যান। সেখানেই তাঁর নতুন প্রকল্পের কেন্দ্র গড়ে তুলেন। ইদলিবে তিনি সংগঠন পুনর্গঠন করেন, রাজনৈতিক ও সামরিক দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব বাড়ান। প্রশাসন ও নিরাপত্তার কাঠামো দাঁড় করিয়ে ইদলিবকে তিনি কার্যত ‘বিপ্লবের রাজধানী’ ও আরও পরিণত, আরও সংগঠিত এক নতুন পর্যায়ের সূচনাবিন্দুতে পরিণত করেন।
২০১৭ সালের শেষভাগে HTS ইদলিব ও পাশের বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় একটি বিকল্প বেসামরিক প্রশাসন গঠন করে, যার নাম ‘হুকুমাতু ইনকায’ বা Syrian Salvation Government (SSG)।
SSG ছিল একটি বেসামরিক প্রশাসন, যার অধীনে ১০টি মন্ত্রণালয় এবং ৭৫ সদস্যের একটি শুরা কাউন্সিল ছিল। অর্থনীতিতে SSG ‘ইসলামি অর্থনীতি’ ও ফ্রি মার্কেট মডেল অনুসরণ করত। তুর্কি লিরা ব্যবহার, বিভিন্ন ট্যারিফ, সীমান্ত কর এবং জ্বালানি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ SSG-এর হাতে।
সংখ্যালঘুদের বিষয়ে SSG অনেক ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়, খ্রিস্টান, দ্রুজ ও আলাউই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সম্পত্তি ফেরত দেওয়া এবং গির্জা পুনরায় চালুর অনুমতি দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের শীর্ষে
ইদলিবে নিজের শক্ত ঘাঁটি পাকা করার পর, আসাদ সরকার দুর্বলতম অবস্থায় পৌঁছালে সিরিয়ার ক্ষমতার সমীকরণ পাল্টে যায়। সেই প্রেক্ষাপটে আহমদ শারা ঘোষণা দেন চূড়ান্ত অভিযান শুরুর। অভিযানের লক্ষ্য এক এক করে প্রদেশগুলো মুক্ত করা, দামেস্কে অগ্রসর হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করা।
দামেস্ক ছিল আহমাদ আশ শারার বহু বছরের প্রকল্পের চূড়ান্ত লক্ষ্য। রাজধানীতে প্রবেশের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায় তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক–সামরিক পথচলা। একসময় যিনি একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর কমান্ডার ছিলেন, তিনিই হয়ে ওঠেন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান। এই ঘোষণার পর সিরিয়ার রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয় এবং নতুন দিকচিহ্ন পায় আহমাদ আশ শারার রাজনৈতিক যাত্রা।
সূত্র : আসির











