ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের পঞ্চম দিন : যা যা ঘটলো, জানুন সারমর্ম

Iran-Israel-US

ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নিয়ন্ত্রণ
সম্প্রতি মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোকে (Launch Pads) লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার সক্ষমতা কমিয়ে আনা।

সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ব্যাহত করা
তেহরানে ইরানের ‘সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’-এর সদর দপ্তর, রাষ্ট্রপতির কার্যালয় এবং ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ ভবনে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলা চালানো হয়েছে। যাতে দেশটির নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।

সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য নির্ধারিত গোপন এলাকা ‘মিনজাদেহি’ (Minzadeh), ড্রোন ও মিসাইল তৈরির প্রধান কেন্দ্র ‘পারচিন’ (Parchin) সামরিক কমপ্লেক্স এবং রিভল্যুশনারি গার্ডের (IRGC) একটি স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে যেখানে ভূমি থেকে ভূমিতে এবং ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য মিসাইলের যন্ত্রাংশ তৈরি করা হতো। এছাড়া সলিড ফুয়েল তৈরির কাঁচামাল উৎপাদনকারী কারখানাতেও আঘাত হানা হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ ফ্রন্টে অস্থিরতা
ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পশ্চিম আজারবাইজান এবং কুর্দিস্তান প্রদেশে রিভল্যুশনারি গার্ডের স্থল বাহিনী ও সীমান্তরক্ষীদের সদর দপ্তরে বোমাবর্ষণ করা হয়েছে।

স্থল অভিযানের সম্ভাবনা
রয়টার্সের তথ্যমতে, ইরানের কুর্দি গোষ্ঠীগুলো পশ্চিম ইরানে সরকারি বাহিনীর ওপর হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা করছে। সিএনএন-কে একজন উর্ধ্বতন কুর্দি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাদের বাহিনী ‘আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পশ্চিম ইরানে স্থল অভিযান শুরু করবে।

আঞ্চলিক বিস্তার
ইরাকের বাগদাদের উত্তরে ‘জুরফ আল-সাখর’ এলাকায় কাতায়েব হিজবুল্লাহর অবস্থান এবং নিনাওয়া সমভূমিতে হাশদ আল-শাবির সদর দপ্তরে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন-ইসরায়েলি জোট।



লেবানন পরিস্থিতি

৩ মার্চ ইসরায়েলি বিমান বাহিনী লেবাননের হিজবুল্লাহর প্রায় ৬০টি লক্ষ্যবস্তুতে (অস্ত্রাগার, মিসাইল লঞ্চার ও কমান্ড সেন্টার) হামলা চালিয়েছে। এছাড়া কুদস ফোর্সের লেবানন বিষয়ক প্রধান দাউদ আলী জাদেহ-কে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।

উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা
ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও মিসাইল হামলা অব্যাহত রেখেছে। এর ফলে রিয়াদ (যেখানে সিআইএ স্টেশন অবস্থিত) এবং কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা
অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী প্রধান সড়কগুলোতে চেকপোস্ট বসিয়েছে। এছাড়া দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে ইন্টারনেট সংযোগ এখনো বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ
রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম সচল রাখতে ইরান সরকার বড় ধরনের প্রশাসনিক পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। প্রাদেশিক গভর্নরদের হাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ব্যাপক প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও নির্বাহী ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে।

ইরাকি মিলিশিয়াদের তৎপরতা
ইরাকের শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কুর্দিস্তানে মার্কিন উপস্থিতি এবং বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে মার্কিন দূতাবাসের লজিস্টিক সাপোর্ট ক্যাম্পে হামলা অব্যাহত রেখেছে।

হিজবুল্লাহর পাল্টা হামলা
লেবাননের হিজবুল্লাহ উচ্চ গ্যালিলির ‘মায়ান বারুখ’ সাইট, হাইফা নৌঘাঁটি এবং অধিকৃত গোলান মালভূমির ‘কিলা’ ব্যারাকে হামলা চালিয়েছে। তারা দক্ষিণ লেবাননের সম্মুখভাগে ইসরায়েলের ৫টি ট্যাংক ধ্বংস করার দাবি করেছে।

বিশ্লেকদের পর্যবেক্ষণ যা বলছে

ইরানের কৌশল পরিবর্তন
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের হার তুলনামূলকভাবে কমে আসা এটা নির্দেশ করে যে, তারা সম্ভবত ‘মিসাইল সোয়ার্মিং’ বা গণ-আক্রমণের ক্ষেত্রে এখন ড্রোনের ওপর বেশি নির্ভর করার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি এটি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোর ওপর হামলার ফলে তাদের সক্ষমতা হ্রাসের বিষয়টিও সামনে নিয়ে আসে।

ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ও খরচ নিয়ন্ত্রণ
বিপরীতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল তাদের ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের (প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র) ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা করছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো মজুত ফুরিয়ে যাওয়া রোধ করা এবং আকাশচুম্বী আর্থিক ব্যয় এড়িয়ে চলা।

দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের প্রস্তুতি
মোদ্দা কথা, উভয় পক্ষই একে অপরকে ক্লান্ত করে ফেলার এবং দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে লড়ার সক্ষমতা নষ্ট করে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও স্থলযুদ্ধ
মনে হচ্ছে ওয়াশিংটন ইরানের অভ্যন্তরে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে সমর্থন দেওয়ার ব্যাপারে গুরুত্ব দিচ্ছে। এটি ইরাক, তুরস্ক এবং আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে স্থল সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

আরো পড়ুন

বিজ্ঞাপন