ইসলামি প্রজাতন্ত্রে দিনটি আর দশটা দিনের মতো ছিল না। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আর বিশ্বজুড়ে সংবাদ সংস্থাগুলো যে খবর দিচ্ছিল, তা নিছক কোনো সাধারণ সংবাদ ছিল না। খবরটি ছিল, ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিজ কার্যালয়ে প্রাণ হারিয়েছেন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ইরানি প্রথা মেনেই ঘোষণাটি ছিল তথ্যে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন কিন্তু সারবত্তায় একদম স্পষ্ট। পর্দায় সংবাদ পাঠকদের মুখ ছিল তেহরানের জমাট অন্ধকারের চেয়েও বিবর্ণ। এ কোনো সাধারণ মৃত্যু ছিল না, ছিল না বার্ধক্যের শয্যায় নিভৃত প্রস্থানও। এ যেন খোদ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের হৃদপিণ্ডে এক প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প।
এই খবরের গুরুত্ব নিহিত ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে আলি খামেনির বিশেষ অবস্থানে। প্রতিষ্ঠাতা সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর রাষ্ট্রের কাঠামো স্থিতিশীল করতে তিনি পালন করেছিলেন কেন্দ্রীয় ভূমিকা। গত প্রায় ৩৭ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে বিরোধের রাজনীতিতে তিনিই ছিলেন প্রধান মুখ। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি এক বিশাল আঞ্চলিক প্রভাব বলয় গড়ে তোলেন, যার বিস্তার ছিল চারটি আরব রাজধানী পর্যন্ত। অথচ শেষ পর্যন্ত তেহরানের সুরক্ষিত নিজ কমপ্লেক্সেই হামলার শিকার হতে হলো তাঁকে। এর ফলে ইরান এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল, যার পরিণতি ও ভবিষ্যৎ গতিপথ এখনো সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।
বিশ্লেষকদের মতে, খামেনি-পরবর্তী ইরান এক রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি। তাঁর অনুপস্থিতিতেই সামনে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের ছক, যা দীর্ঘায়িত হওয়ার শঙ্কা প্রবল। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর হুঁশিয়ারি। তাঁদের সাফ কথা, এই যুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্য ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন।

তবে খামেনির প্রস্থান মানেই কি তেহরানের মসনদ ধসে পড়া? বিশ্লেষকরা তা মনে করেন না। ইরানের রাষ্ট্রকাঠামো এমনভাবে তৈরি, যা যেকোনো বড় ধাক্কা সামলে নিতে সক্ষম। ধারণা করা হয়, এমন চরম পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে খামেনি নিজেও আগেভাগে কিছু প্রস্তুতি রেখে গেছেন।
তা সত্ত্বেও তাঁর অনুপস্থিতি যে রাষ্ট্রযন্ত্রের গতিপ্রকৃতি বদলে দেবে, তা স্পষ্ট। বিশেষ করে খামেনি-পরবর্তী অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং ওয়াশিংটন-তেল আবিবের সঙ্গে চলমান সংঘাতের রেশ টেনে নেওয়া—এই দুই ফ্রন্টে তেহরান কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
শূন্যতা যখন বাস্তবতা
১৯৭৯ সালের ইরানি সংবিধানের ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদে নেতৃত্বের এই শূন্যতা পূরণের স্পষ্ট বিধান রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দেশ চালাবেন একটি অস্থায়ী পরিষদ। যেখানে থাকবেন প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান এবং শাসন পরিষদের একজন প্রতিনিধি।
তবে সাংবিধানিক এই ছক যতটা পরিষ্কার, রাজনৈতিক বাস্তবতা ততটাই জটিল। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির অনুপস্থিতি ইরানকে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যেখানে দেশটি চারপাশ থেকে নজিরবিহীন চাপে পিষ্ট।
স্মৃতি হাতড়ালে দেখা যায়, রুহুল্লাহ খোমেনির প্রয়াণের পর পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। একদিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রণংদেহী সংঘাত, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা। এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে তেহরানের রাস্তায় কতটা শৃঙ্খলা বজায় থাকবে, তা নির্ভর করছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ভূমিকার ওপর।
বাস্তবতার নিরিখে আইআরজিসি এখন এক ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার মুখে। সংবিধান অনুযায়ী ইসলামি প্রজাতন্ত্র রক্ষার মূল ভার এই বাহিনীর ওপরই ন্যস্ত। ফলে পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনে পর্দার আড়ালে বা সামনেসবচেয়ে প্রভাবশালী কুশীলব হিসেবে তাদেরই দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
অনিশ্চয়তার মুখে অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব
নিহত হওয়ার আগে আলী খামেনি দেশের গুরুভার ন্যস্ত করেছিলেন আলী লারিজানির ওপর, যিনি দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব। আজ রোববার, ১ মার্চ ২০২৬ সকালে লারিজানি দেশ পরিচালনার জন্য একটি অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদ গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন।
তবে এই কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দেওয়া লারিজানির জন্য মোটেও সহজ হবে না। খামেনির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাও একই হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। ফলে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে এখন এক ধরনের বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা কাজ করছে। এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্বের সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন সব চ্যালেঞ্জ।
সংকটের গভীরতা কোথায়, তা ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অজানা নয়। তাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আদর্শিক ও রাজনৈতিকভাবে খামেনির সমকক্ষ বিকল্প কে হতে পারেন? উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই এখন তেহরানের প্রধান লক্ষ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব এই পথ মোটেও মসৃণ হতে দেবে না। ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতই হতে যাচ্ছে আগামীর রূঢ় বাস্তবতা। ফলে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণের প্রায় পুরোটাই এখন যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।
৮৬ বছর বয়সি খামেনির উত্তরসূরি কে হবেন তা নিয়ে গত বছর থেকেই গুঞ্জন ছিল। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। তবে এত দিন তা ছিল পর্দার আড়ালে। খামেনির পছন্দ আর বিপ্লবী গার্ডের আস্থা, এই দুই সমীকরণ মিলিয়েই আসছিল কিছু সম্ভাব্য নাম।
খামেনির মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তেহরানের সামনে এখন মূলত তিনটি পথ খোলা। প্রথমত, আগে থেকেই আলোচনায় থাকা নামগুলোর মধ্য থেকে কাউকে বেছে নেওয়া; দ্বিতীয়ত, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তালিকায় নতুন কোনো নাম যোগ করা; আর তৃতীয়ত, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে খোদ বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) সরাসরি হস্তক্ষেপে ক্ষমতার নতুন মেরুকরণ।
তবে ক্ষমতার এই পালাবদলের চেয়েও বড় বাস্তবতা এখন যুদ্ধ। ইরানের প্রচলিত সামরিক শক্তি দিয়ে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি রণক্ষেত্রে পরাস্ত করা কঠিন—এটি অনস্বীকার্য। কিন্তু কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে দেশটির কয়েক দশকের পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে ফেলা যাবে, এমন ধারণাও সম্ভবত অতিসরলীকরণ। কারণ, ইরানের এই রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেছে সংকটের ভেতরেই টিকে থাকার মন্ত্র নিয়ে।
এই মুহূর্তে প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ড এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ আলী লারিজানির প্রধান লক্ষ্য হলো, ন্যূনতম ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্ব রক্ষা করা। সংঘাতের পারদ কমিয়ে একটি আপাত স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে পারলেই কেবল নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি চরমে গেলেও তেহরান সম্ভবত তার পুরোনো কৌশলগত অবস্থান থেকে সরবে না। অর্থাৎ একদিকে যুদ্ধের দামামা বজায় রাখা, অন্যদিকে কূটনীতির জানালা খোলা রাখা; যাতে খাদের কিনারা থেকে নিরাপদ দূরত্বে ফেরা যায়। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিতে ইরানের এই ‘টিকে থাকার কৌশল’ হয়তো কঠিন হতে পারে। শেষ পর্যন্ত এই লড়াইটি যতটা না সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের, তার চেয়েও বেশি নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং অভ্যন্তরীণ ঐক্য অটুট রাখার।
গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় খামেনি তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে যেসব নাম বিবেচনায় নিয়েছিলেন, বর্তমানের এই বহুমাত্রিক চাপে তাঁদের কেউই ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে রক্ষার নিরঙ্কুশ নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না। ফলে সামনের দিনগুলোতে ইরানের প্রতিটি পদক্ষেপই হবে মেপে মেপে ফেলা। যেখানে লক্ষ্য কেবল জয় নয়, বরং টিকে থাকা।
কঠিন বিকল্প, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শূন্যতা পূরণ করা সহজসাধ্য নয়। তিনি কেবল একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, ছিলেন এক কুশলী রণকৌশলবিদ। নিজেকে নিছক ফতোয়া প্রদানকারী আলেম হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রধান রাজনৈতিক স্থপতি হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তিনি। ইরানের রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, সশস্ত্র বাহিনী থেকে শুরু করে অর্থনীতি ও গণমাধ্যম—সবখানেই ছিল তাঁর প্রত্যক্ষ প্রভাব।
খামেনির হাত ধরেই গড়ে উঠেছিল ইরানের এক জটিল ও বহুস্তরীয় পররাষ্ট্রনীতি। তাঁর সময়েই ‘আমেরিকার মৃত্যু’ স্লোগানটি কেবল রাজপথের আওয়াজ নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের কৌশলগত অবস্থানের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েক দশকের এই বৈরিতা ইরানকে এক অনমনীয় আদর্শিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়েছিল।
খামেনি-পরবর্তী যুগে ইরান হয়তো পুরোনো কিছু আদর্শিক সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পাবে, তবে তাতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের টিকে থাকার নিশ্চয়তা মিলছে না। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন যে ‘রক্ষাকবচ চুক্তির’ কথা বলে, বর্তমান ইরানি রাষ্ট্রকাঠামোয় তা খুব একটা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ তেহরানের এই ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি, যা হয় পূর্ণ শক্তিতে টিকে থাকবে, নয়তো একবারে ভেঙে পড়বে। মাঝপথে আপসের সুযোগ এখানে সামান্যই।
আগামীর ইরান এক গোলকধাঁধাঁপূর্ণ ভবিষ্যতের মুখোমুখি। এই সন্ধিক্ষণে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ভূমিকা এবং চলমান যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি। ‘উলায়াতে ফকিহ’ বা সর্বোচ্চ নেতার শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে একজন উত্তরসূরি অপরিহার্য বটে, কিন্তু আইআরজিসি যদি স্থিতিশীল না থাকে, তবে নতুন নেতার পক্ষে অভ্যন্তরীণ বৈধতা কিংবা বিদেশি মিত্রদের আস্থা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।











