রহমত, মাগফিরাত ও নাযাতের বার্তা নিয়ে আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়ছে মুবারক মাস রমজান। কিন্তু গাজার বিধ্বস্ত রাজপথ, ছিন্নভিন্ন তাঁবু, ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা নড়বড়ে ঘরবাড়ি আর আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আজ হাজারো প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। বাস্তুচ্যুত ও গৃহহীন মানুষগুলোর আর্তনাদ—এভাবেই কি চলবে সব? কোথায় আমাদের আরব ও মুসলিম ভাইয়েরা? কোথায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়? কোথায় আজ মানবতা?
যুদ্ধবিরতি চুক্তির কয়েক মাস পেরিয়ে গেছে, যুদ্ধ এখনো থামেনি। মানবিক পরিস্থিতি এখনো চরম নিষ্ঠুর ও কঠিন। ধ্বংসের গভীর ক্ষত দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে যেন বিদ্রূপ করছে।
কঠিন মানবিক বাস্তবতা
মৌলিক পরিষেবার তীব্র অভাব, দারিদ্র্য ও বেকারত্বের কশাঘাত, এবং স্বাস্থ্য ও মানসিক সংকটের আবর্তে ধুঁকছে গাজার মানুষ। পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চলছে অত্যন্ত ধীরগতিতে, আর মানবিক সহায়তাও প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। ফলে জীবন এখন আর স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার চেয়ে বরং প্রতিদিনের বেঁচে থাকার এক মরণপণ লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনৈতিকভাবে মানুষ আজ নিঃস্ব। আয়ের উৎস হারিয়ে, কর্মসংস্থানের অভাবে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব আকাশ ছুঁয়েছে। বহু পরিবার অনিয়মিত মানবিক ত্রাণের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল, যা তাদের ক্ষুধার জ্বালা মেটাতেও অপর্যাপ্ত।
স্বাস্থ্যখাতের অবস্থা আরও ভয়াবহ। যুদ্ধের শুরু থেকেই ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবলের তীব্র সংকট ছিল, যা এখন চরমে পৌঁছেছে। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো বিধ্বস্ত হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগী এবং যুদ্ধাহতরা প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন না। তার ওপর দূষিত পানি, অপুষ্টি এবং কঠিন জীবনযাত্রার কারণে মহামারী ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি প্রবল হয়ে উঠেছে।
প্রকৃতির বৈরী আচরণ এই মানুষের দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। বৃষ্টির তোড়ে ভেসে যাচ্ছে বাস্তুচ্যুতদের তাঁবু, হাড়কাঁপানো শীতে জমে মারা যাচ্ছে শিশুরা। বোমার আঘাতে নড়বড়ে হয়ে যাওয়া ঘরগুলো ধসে পড়ে কেড়ে নিচ্ছে অসহায় প্রাণ। কাদা, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ আর স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে মানুষের মর্যাদা আজ ভুলুণ্ঠিত।
অবকাঠামো বলতে আর প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। পানি, বিদ্যুৎ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ধ্বংসপ্রাপ্ত বা আংশিক সচল। রাস্তাঘাট ভাঙা, যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন। এই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝে সত্যিকারের পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখা যেন বিলাসিতা, যা একমাত্র ব্যাপক ও টেকসই পুনর্গঠনের মাধ্যমেই সম্ভব।
ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি
এই মানবিক বিপর্যয়ের সাথে যুক্ত হয়েছে এক তথাকথিত যুদ্ধবিরতি। নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল ও অস্থির। সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির সময়সীমার মধ্যেও ইসরায়েলি দখলদার বাহিনী শত শত বার হামলা চালিয়েছে—কখনও বিমান হামলা, কখনও গোলাবর্ষণ। এই ভঙ্গুর পরিস্থিতির মধ্যেও ঝরছে রক্ত, বাড়ছে শহীদের মিছিল।
সীমান্ত ও অবরোধের চিত্র
২০২৫ সালের সীমান্ত কার্যক্রমের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ২২০ দিনই সীমান্ত বন্ধ রেখেছিল দখলদার বাহিনী। সরকারি তথ্য অফিসের প্রধান ইসমাইল সওয়াবতার মতে, একই বছর ১ লাখ ৩২ হাজার ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে। গাজার জন্য প্রয়োজনীয় ১৮ হাজার ২৫০টি জ্বালানি ট্রাকের মধ্যে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছে মাত্র ১,৪৬০টি।
বাণিজ্য, ত্রাণ, এমনকি পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রবেশে এই বাধা যুদ্ধবিরতি চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন। দখলদার বাহিনী গাজার প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করছে, আটকে দিচ্ছে ওষুধ, খাবার ও চিকিৎসার সুযোগ।
একটি সামগ্রিক ও দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গি
গাজায় এখন কেবল জরুরি ত্রাণের প্রয়োজনই না, প্রয়োজন এমন এক সমন্বিত ও দায়িত্বশীল উদ্যোগের যা মানুষের জীবন বাঁচাবে, মর্যাদা রক্ষা করবে এবং সত্যিকারের পুনরুদ্ধারের পথ দেখাবে। এর জন্য পাঁচটি ধাপ জরুরি:
১. জরুরি মানবিক সহায়তা: খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি ও পানির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং সীমান্তগুলো নিঃশর্তভাবে খুলে দেওয়া।
২. বেসামরিক সুরক্ষা: আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করে নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া এবং অবরোধ বা ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করা।
৩. স্বাস্থ্যখাত পুনর্গঠন: হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো সচল করা এবং চিকিৎসার প্রয়োজনে বিদেশে যাওয়ার পথ সুগম করা।
৪. শিক্ষা ব্যবস্থা রক্ষা: স্কুলগুলো পুনরায় চালু করা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শিক্ষাগত সহায়তা দিয়ে একটি প্রজন্মকে হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করা।
৫. ত্রাণ থেকে পুনরুদ্ধারে উত্তরণ: কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জীবিকার উপায় বের করা, যাতে মানুষ ত্রাণের ওপর নির্ভর না করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।
কার্যকর ও প্রভাবশালী ভূমিকা
আরব ও মুসলিম বিশ্বের কাছে গাজাবাসীর প্রত্যাশা এখন আর কেবল মৌখিক সহমর্মিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ। মৌসুমী সাহায্যের গণ্ডি পেরিয়ে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী মানবিক অংশীদারিত্ব, যা গাজার মানুষকে তাদের বেঁচে থাকার অধিকার ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে দেবে।
সমন্বয় পরিষদ গঠন
ত্রাণ কার্যক্রম ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সুসংহত করতে তুরস্ক, মিশর ও জর্ডানের সমন্বয়ে একটি ‘সমন্বয় পরিষদ’ গঠনের প্রস্তাব করা হচ্ছে, যেখানে অন্যান্য আরব ও মুসলিম দেশও যুক্ত হতে পারে। এই পরিষদের লক্ষ্য হবে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা এবং ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে সীমান্তগুলো নিরাপদ মানবিক করিডোর এবং পরবর্তীতে বাণিজ্যিক পথে রূপান্তরিত হতে পারে। এতেই গাজার অর্থনীতি ও জনজীবন আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।











