কেমন কাটবে গাজার শরণার্থী শিবিরের রমজান

সবকিছুর পরও রমজান সুন্দরই থাকবে, মোহনীয় হয়ে।
RAMADHAN-GAZA

রমজান কড়া নাড়ছে দুয়ারে। কিন্তু গাজায়ও কি রমজান আসছে সবখানের মতই? উপত্যকার মধ্যভাগে অবস্থিত বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে এবারের পরিবেশটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। নেই কোনো ঝুলন্ত ফানুস, নেই ঘরবাড়ি আলোকিত করা বর্ণিল সাজসজ্জা। চারদিকে কেবল অস্থায়ী তাঁবুর সারি। তবুও, এই নিষ্ঠুর বাস্তবতার মাঝেও শিশুরা তাদের মতো করে আনন্দ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছে, আঁকড়ে ধরতে চাইছে পবিত্র এই মাসের রূহানিয়াতকে; তাদের মত করে।

আল জাজিরার ক্যামেরায় ধরা পড়ে শরণার্থী শিবিরের ভেতরে একদল শিশুর খেলাধুলার দৃশ্য। তাদের এই উচ্ছ্বাস যেন ঘোষণা করছে—রমজান আসছে; যুদ্ধ এখনও আমাদের আশাকে ধূলিসাৎ করতে পারেনি। লাজুক হাসি আর বয়সের চেয়েও ভারি সব কথার মাঝে শিশুরা বর্ণনা করে, কীভাবে তারা যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি আর স্বজন হারানোর বেদনার মধ্যেই রমজানকে বরণ করে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

রমজানের আনন্দে মেতেছে গাজার শিশুরা। ছবি : সংগৃহীত

তেরো বছর বয়সী মালাক বলে, ‘সবকিছুর পরও রমজান সুন্দরই থাকবে, মোহনীয় হয়ে!’ সে জানায়, তাঁবুর বাসিন্দারা একে অপরের সহযোগিতায় রমজানের আমেজ তৈরির চেষ্টা করছে, যদিও তাদের ঘরবাড়ি নেই, নেই চেনা সেই পরিবেশ, সেই অনিন্দ্য সুন্দর গাজা। তবে মালাক দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেনে নেয়, তাঁবুর রমজান আর গাজার বাড়িতে থাকা রমজান এক নয়। বাড়িতে পরিবার আর প্রতিবেশীদের নিয়ে যে জমজমাট ইবাদত আর সাহরি-ইফতারের আয়োজন হতো, তা আজ কেবলই স্মৃতিমাত্র, নস্টালজিক হয়ে স্বপ্নে ধরা দেয় কেবল।
অন্যদিকে, তেরো বছরের আরেক কিশোরী সাবাহের কণ্ঠে ঝরে পড়ে হাহাকার। সে জানায়, এ বছর প্রস্তুতির কোন সরঞ্জামই নেই। দারিদ্র্য তো আছেই, তার ওপর নেই বিদ্যুৎ, আর এই ঘিঞ্জি তাঁবুতে ঘুমানোর জায়গাই হয় না, সাজাবো কোথায়? আগে তারা দিনের পর দিন রমজানের প্রস্তুতি নিত, রমজানকে খোশ আমদেদ করতে থাকত কত আয়োজন! যেন একটুকরো জান্নাত নেমে আসত গাজার অলিগলিতে। আর আজ? রমজানের প্রস্তুতির কথা চিন্তা করাটাও যেন এক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হারিয়ে যাওয়া ফানুস
বারো বছরের শায়মা পুরো পরিস্থিতিকে এক মর্মস্পর্শী বাক্যে তুলে ধরে: ‘আমরা রমজানে খুশি হই ঠিকই, কিন্তু খুশি সাথে নিয়ে আসে এক বুক হাহাকার, যন্ত্রনা।’

যুদ্ধে বাবাকে হারানো শায়মা ভাইবোনদের সাথে গাদাগাদি করে থাকে এক ছোট্ট তাঁবুতে। বাবার স্মৃতি এ মাসে তাকে বড্ড বেশি কাঁদায়। অন্য মেয়েদের যখন বাবার হাত ধরে হাঁটতে দেখে, তখন তার বুকের ভেতরটা এক অপূরনীয় মহা শূন্যতায় ভরে ওঠে।

অন্যদিকে, এক কোণে পাঁচ বছরের ছোট্ট লামিস বন্ধুদের সাথে খেলায় মগ্ন। তার কোনো ফানুস নেই। সরল শিশুসুলভ উত্তর—’হারিয়ে গেছে’। ছোট্ট বাক্যটিতে যেন লুকিয়ে আছে গাজার শিশুদের এক বিশাল ট্র্যাজেডি—যেখানে শুধু খেলনা নয়, হারিয়ে যায় ঘরবাড়ি, হারিয়ে যায় বাবারাও।
এভাবেই গাজার শিশুরা এবার রমজানকে বরণ করছে—এক ফালি অসম্পূর্ণ হাসি আর কান্নার নোনাজলে ভেজা আনন্দ নিয়ে। তাদের বুকে এক অদম্য আশা—হয়তো যুদ্ধের চেয়ে খানিক দয়ালু হবে এই রমজানের দিনগুলো। তাঁবুর জীবন, বাস্তুচ্যুতি আর হারানোর বেদনার মাঝেও শিশুরা খেলছে, অপেক্ষা করছে রমজানের… কারণ দিনশেষে তারা তো শিশুই।

ডিম কার্টনের মিটমিটে আলো
দেইর আল-বালাহ। ক্যাম্পে রমজানের সাজসজ্জার সরঞ্জাম বাজার থেকে আসে না, আসে ফেলে দেওয়া কাগজ আর ডিমের কার্টন থেকে। এই সাজসজ্জা কোনো পাকা দালানের দেয়ালে নয়, ঝুলছে জরাজীর্ণ তাঁবুর গায়ে, যে তাবুগুলো শীত বা ভয়—কোনোটা থেকেই সুরক্ষা দিতে পারে না। নির্মম বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে বাস্তুচ্যুত মানুষগুলো নিজেদের মতো করেই মোবারক মাসটিকে বরণ করতে চাইছে।

রমজানের আনন্দে মেতেছে গাজার শিশুরা। ছবি : সংগৃহীত

আল জাজিরার ক্যামেরা যখন জরাজীর্ণ তাঁবুর সারিগুলোর মাঝ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন চোখে পড়ে প্রবেশপথে ঝুলছে হাতে বানানো সাধারণ ফানুস আর তাতে জ্বলে থাকা জোনাক পোকার মত মৃদু আলো। ক্লান্ত হাতগুলো দিয়ে তৈরি এই সাজসজ্জা যেন শিশুদের যাপিত জীবনে এক মুহূর্তের আনন্দ তৈরির প্রাণপণ চেষ্টা।

বেইত হানুন থেকে আসা উম্মে ফাতেহিয়া আবু আওদা বলেন, ‘তাঁবু সাজানো এখন কোনো বিলাসিতা নয়, বরং মনের বেঁচে থাকা আশাটুকু টিকিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা, এতটুকুই।’ কাগজ আর ডিমের খালি খোসা দিয়ে সাজসজ্জা তৈরির করুণ বর্ণনা দেন তিনি, উদ্দেশ্য একটাই—আতঙ্ক আর স্বজন হারানো শিশুদের মুখে এক চিলতে হাসি ফোটানো।

গত রমজানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “তখন আমার শহীদ ছেলে সবকিছু সামলাত।” আজ আর কেউ নেই সেই ভার নেওয়ার, আছে শুধু বুকভরা সবর। কিডনি ব্যাধি আর উচ্চ রক্তচাপে ভোগা এই মা জরাজীর্ণ তাঁবুতে বসে ক্লান্ত কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা তো বেঁচে নেই, শুধু বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি।’

কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন মানাল আল-ইয়াজি। বেইত হানুন থেকে গাজা, তারপর সেখান থেকে দেইর আল-বালাহ—পাঁচ মাস ধরে তাঁবুই তার ঘর। দুই সন্তানকে হারিয়েছেন, এখন সাত এতিম বাচ্চার দায়িত্ব তার কাঁধে। তিনি বলেন, ‘রমজান আমাদের প্রিয়, কিন্তু এই পরিস্থিতিতে তা বড্ড ভারী মনে হয়।’ তবুও শিশুদের যাতে মন না ভাঙে, তাই হাসিমুখেই তিনি বলেন, ‘ওদের জন্যই তাঁবু সাজাই, ওদের তো কোনো দোষ নেই।’

সুহা আবু আওদা এই সাজসজ্জাকে দেখছেন এক ধরনের ‘নীরব প্রতিরোধ’ হিসেবে। তিনি জানান, কীভাবে ক্যাম্পের ছেলেমেয়েরা মিলে কার্ডবোর্ড আর সামান্য কিছু রং জোগাড় করে শূন্য হাতেই তৈরি করেছে এই রমজানের সাজ।
দেইর আল-বালাহ ক্যাম্পে রমজানের পরিমাপ ইফতারের টেবিলের খাবারে হয় না, হয় হৃদয়ের আবেগে। সামান্য সাজসজ্জা, ক্লান্ত হাসি আর ছোট্ট ফানুসের আলোর আড়ালে মায়েদের লুকানো কান্না… এভাবেই তাঁবুর ফাঁক গলে গাজাবাসী বরণ করে নিচ্ছে এবারের রমজান।