হাজার বছরের পুরনো এক ইংরেজ দিনারে ইসলামের কালিমার রহস্য!

কিন্তু তাঁর রাজত্বের শেষ দিকে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে; মুদ্রা থেকে ক্রুশ চিহ্ন ও রাজার ছবি অদৃশ্য হয়ে যায় এবং সেখানে একটি স্বর্ণের দিনার আবির্ভূত হয়, যাতে খোদাই করা ছিল তাওহিদ ও ইসলামের বাণী।
image_editor_output_image718452002-1770736979713

ইসলামের সাথে ইউরোপীয় দেশগুলোর সম্পর্কের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। এই সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল সেই সময়, যখন মুসলিমরা ইউরোপ মহাদেশের পূর্ব ও পশ্চিম—উভয় প্রান্তেই পদার্পণ করেছিলেন। শুরুতে পূর্বের বাইজেন্টাইনদের সঙ্গে মোকাবিলার মাধ্যমে এই যাত্রার সূত্রপাত হয়। অন্যদিকে, পশ্চিমে মুসলিমরা আন্দালুস (স্পেন) জয় করতে সক্ষম হন এবং উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে প্যারিসের কাছাকাছি পৌঁছে যান; তবে ‘বালাতুশ শুহাদা’ (ট্যুরসের যুদ্ধ) এই অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিয়েছিল।

আমির শাকিব আরসালান তাঁর “ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, ইতালি ও ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে আরবদের অভিযানের ইতিহাস” গ্রন্থে প্রমাণ করেছেন যে, পশ্চিম ইউরোপে মুসলিমদের উপস্থিতি কেবল স্পেন, পর্তুগাল ও ফ্রান্সের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং ইসলামের প্রাথমিক শতাব্দীগুলোতেই তা সুইজারল্যান্ড ও ইতালি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। এভাবেই ইউরোপীয়রা খুব দ্রুতই ইসলাম ধর্ম এবং তার অনুসারীদের সংস্পর্শে আসে। ফলে সমসাময়িক বিশ্বে প্রবল বেগে ছড়িয়ে পড়া এই নতুন সভ্যতার দ্বারা ইউরোপ প্রভাবিত হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক।

পাশ্চাত্যের সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক কেবল যুদ্ধ আর তলোয়ারের ঝনঝনানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এই সম্পর্ক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও বিস্তৃত ছিল। উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগে ইসলামের জাগরণ, বিজ্ঞান ও জ্ঞানের উৎকর্ষতা এবং বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ফলে ইসলামি সভ্যতা এমন এক মডেলে পরিণত হয়েছিল, যার দিকে পশ্চিমা ও রুশসহ বিশ্বের সমস্ত জাতি চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকত।

ঐতিহাসিক উইল ডুরান্ট তাঁর ‘দ্য স্টোরি অফ সিভিলাইজেশন’ নামক এনসাইক্লোপিডিয়ায় এই সত্যটিই স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন: ‘৭০০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ পাঁচশ বছর ধরে শক্তি, শাসনব্যবস্থা, সাম্রাজ্যের বিস্তার, আচার-আচরণ ও নৈতিকতা, জীবনযাত্রার মান, মানবিক ও দয়ালু আইন প্রণয়ন, ধর্মীয় সহনশীলতা, সাহিত্য, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, বিজ্ঞান, চিকিৎসা এবং দর্শনে ইসলাম সমগ্র বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে।’ নিঃসন্দেহে, এই নৈতিক, ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক সমৃদ্ধি ইসলামকে বিশ্ববাসীর কাছে একটি আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, যার দিকে তারা সশ্রদ্ধ চিত্তে তাকাত এবং একে অনুসরণ ও অনুকরণ করার চেষ্টা করত।

অফ্ফা রেক্সের যুগ

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে রোমে ব্রিটেনে খোদাই করা একটি স্বর্ণমুদ্রা (দিনার) আবিষ্কৃত হয়, যার উভয় পাশে আল্লাহর একত্ববাদ এবং মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়তের সাক্ষ্য সম্বলিত ঈমানি বাণী খোদাই করা ছিল। যদিও রোমে আবিষ্কৃত এই দিনারটি আরও কয়েক শতাব্দী আগেই তৈরি হয়েছিলো, তবে ১৮৪১ সালে মুদ্রাতত্ত্ববিদ অ্যাড্রিয়ান লো লংপিয়ার এটি নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে ব্রিটেনের ‘কয়েন কালেক্টরস সোসাইটি’ তে পাঠানোর পরেই এটি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।

সেই প্রতিবেদনটি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এই দিনারটি তৈরির হয়েছিল ব্রিটিশ রাজা অফ্ফা রেক্সের (OFFA REX) শাসনামলে। আজ থেকে প্রায় ১২০০ বছর আগে অষ্টম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে তিনি জীবিত ছিলেন। অফ্ফা রেক্স ছিলেন একজন প্রভাবশালী অ্যাংলো-স্যাক্সন রাজা। দীর্ঘকাল যুদ্ধবিগ্রহের পর ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের বিবাদমান রাজ্যগুলোকে ‘মার্সিয়া’ সাম্রাজ্যের অধীনে একত্রিত করেছিলেন তিনি। প্রায় ৪০ বছর রাজত্ব করা এই রাজাকে তৎকালীন যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক এবং ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের ঐক্যের অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো: রাজা অফ্ফা কেন ইসলামের কালিমা খচিত এই স্বর্ণমুদ্রা তৈরি করেছিলেন? আর এটি রোমেই বা পাওয়া গেল কেন?

খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে ষষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের দিকে ব্রিটেন প্রথমবারের মতো জার্মানদের আক্রমণের সাক্ষী হয়েছিল। এদের অ্যাংলো-স্যাক্সন বা স্যাক্সন বলা হয়, যারা ডেনমার্ক, জুটল্যান্ড দ্বীপ (যা বর্তমানে সুইডেনে অবস্থিত) এবং জার্মানি থেকে আসা স্যাক্সন, অ্যাংলিস এবং জুটদের একটি সম্মিলিত গোষ্ঠী। এই গোষ্ঠীগুলো ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে আক্রমণ চালালে স্থানীয় অধিবাসীদের কাছ থেকে কোনো জোরালো প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়নি। ফলে স্থানীয়রা এই শক্তিশালী আক্রমণকারীদের হাত থেকে বাঁচতে পালিয়ে গিয়ে দক্ষিণ ওয়েলস অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে এবং সেটিকেই তাদের আবাসভূমিতে পরিণত করে।

কিন্তু খুব দ্রুতই এই গোষ্ঠীগুলোর নেতাদের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব শুরু হয়। তবে তারা প্রত্যেকেই নিজস্ব রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। এর ফলে দ্বীপটিতে সাতটি রাজ্যের উদ্ভব ঘটে, সেগুলো হলো: ওয়েসেক্স, সাসেক্স, এসেক্স, ইস্ট অ্যাংলিয়া, মার্সিয়া, নর্থাম্ব্রিয়া এবং কেন্ট। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও ভয়াবহ সংঘর্ষের পর অবশেষে মার্সিয়া রাজ্য এই সকল রাজ্যের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে এবং সবগুলোর নেতৃত্ব গ্রহণ করে। এটি সম্ভব হয়েছিল রাজা অফ্ফা রেক্সের শক্তি ও প্রতিপত্তির কারণে। তিনি ৭৫৭ থেকে ৭৯৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শাসনকাজ পরিচালনা করেছিলেন। তিনি ‘ইংল্যান্ডের রাজা’, ‘সকল ইংরেজদের রাজা’ এবং ‘মার্সিয়ার মহান রাজা’—এই উপাধিগুলো অর্জন করতে সক্ষম হন।

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, অফ্ফা তাঁর সামরিক শক্তির জোরেই দ্বীপটিকে নিজের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করার এই বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছিলেন; আর এই সামরিক শক্তির ভিত্তি ছিল বাণিজ্য থেকে অর্জিত শক্তিশালী আর্থিক উৎস। তাঁর একটি উক্তি উদ্ধৃত করা হয়: “যে রাজা তাঁর জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং নিজের গৌরব অর্জন করতে চান, তাঁর উচিত বাণিজ্যকে সমর্থন ও উৎসাহিত করা।’

এই বক্তব্য বাণিজ্যের প্রতি অফ্ফার গভীর আগ্রহ, অর্থনীতির ওপর তাঁর গুরুত্বারোপ এবং তাঁর চারপাশের ইউরোপীয় শক্তিগুলোর পাশাপাশি ইসলামি বিশ্বের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষাকেই প্রতিফলিত করে—যে ইসলামি বিশ্ব তখন আব্বাসীয় খলিফাদের অধীনে তাদের সভ্যতা ও সামরিক শক্তির চরম শিখরে অবস্থান করছিল।

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাতে আমরা দেখতে পাই, রাজা অফ্ফা তৎকালীন ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজ্যগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। এই কারণেই তিনি ইংল্যান্ড এবং তার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য সহজতর করার লক্ষ্যে ইংরেজদের স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রার আধুনিকায়ন করেন। এর পাশাপাশি ইসলামি বিশ্বের উপরও তার নজর ছিল। সেই সময় আন্দালুস (স্পেন) ও দক্ষিণ ফ্রান্সে বিজয়ের ফলে ইউরোপে মুসলিমদের শক্তিশালী উপস্থিতি ছিল।

অফ্ফা রেক্সের দিনার
অফ্ফা রোমের ক্যাথলিক চার্চের কর্তৃত্ব স্বীকার করতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। কিন্তু তৎকালীন সময়ে ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী সম্রাট শার্লমেন চার্চকে সমর্থন করতেন এবং নিজেকে চার্চের রক্ষক ও সেবক মনে করতেন। তাই অফ্ফার দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং ক্যাথলিক চার্চকে স্বীকৃতি না দেওয়ার শাস্তিস্বরূপ শার্লমেন ইংরেজ বণিকদের ফ্রান্সে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেন। এর ফলে অফ্ফা পোপের প্রভাব মেনে নিতে এবং ইংরেজ চার্চের ওপর পোপের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সম্মত হতে বাধ্য হন।

ইতিহাসবিদ মোস্তফা আল-কান্নানি তাঁর ‘দ্য এরা অব অফ্ফা: কিং অফ ইংল্যান্ড’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ইতিহাসবিদরা লক্ষ করেছেন, অফ্ফার শাসনামলের শুরুতে যেসব মুদ্রা তৈরি করা হয়েছিল, সেগুলোতে খ্রিস্টীয় ক্রুশ চিহ্ন এবং রাজার প্রতিকৃতি থাকত। কিন্তু তাঁর রাজত্বের শেষ দিকে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে; মুদ্রা থেকে ক্রুশ চিহ্ন ও রাজার ছবি অদৃশ্য হয়ে যায় এবং সেখানে একটি স্বর্ণের দিনার আবির্ভূত হয়, যাতে খোদাই করা ছিল তাওহিদ ও ইসলামের বাণী। এই দিনারটিতে হিজরি ১৫৭ সাল (৭৭৪ খ্রিস্টাব্দ) খোদাই করা ছিল।

দিনারের সম্মুখভাগে মার্জিনে খোদাই করা ছিল: ‘محمد رسول الله أرسله بالهدى ودين الحق ليُظهره على الدين كله’ (মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল, তিনি তাঁকে হেদায়েত ও সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন যাতে তিনি একে সকল ধর্মের ওপর বিজয়ী করেন)। এবং কেন্দ্রে খোদাই করা ছিল: ‘لا إله إلا الله وحده لا شريك له’ (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই)। আর দিনারটির উল্টো পিঠের মার্জিনে খোদাই করা ছিল: “بسم الله ضُرب هذا الدينار سنة سبع وخمسين ومئة” (বিসমিল্লাহ, এই দিনারটি একশ সাতান্ন হিজরি সনে তৈরি করা হয়েছে)। এবং কেন্দ্রে খোদাই করা ছিল: ‘د رسول الله’ (মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল), এর সাথে রাজার নাম ‘OFFA REX’।



এই দিনারটি প্রথমবারের মতো রোমের একটি বিক্রয়কেন্দ্রে প্রদর্শিত হয়েছিল। ধারণা করা হয় যে, এটি পোপ প্রথম অ্যাড্রিয়ানকে দেওয়া কোনো উপহার বা বার্ষিক করের অংশ ছিল; কেননা অফ্ফা প্রতি বছর ৩৬৫টি স্বর্ণমুদ্রা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। মুদ্রার খোদাই ও তৈরির পদ্ধতি ছিল সমসাময়িক খলিফা আবু জাফর মনসুরের আমলের আব্বাসীয় দিনারের হুবহু অনুরূপ ছিল।

রাজা অফ্ফা কেন এই মুদ্রাটি তৈরি করেছিলেন, তা নিয়ে ঐতিহাসিক ও গবেষকদের মধ্যে বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে। একদল গবেষক মনে করেন, প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য—এমনকি উমাইয়া শাসক আবদুর রহমান আদ-দাখিল ও তাঁর উত্তরসূরিদের আমলে আন্দালুস (স্পেন) এবং দক্ষিণ ফ্রান্সেও ইসলামি দিনারের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। এই প্রভাবের কারণেই ল্যাটিন ও ইউরোপীয় শক্তিগুলো ইসলামের মডেল অনুসরণ করতে এবং ইসলামি আদলে দিনার তৈরি করতে সচেষ্ট হয়েছিল।

রোমান সাম্রাজ্যের রাজা শার্লমেনের কাহিনীও এই মতবাদটিকে সমর্থন করে, যার ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল ফ্রান্সে, যিনি খলিফা হারুনুর রশিদের যুগে আব্বাসীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার তুমুল চেষ্টা চালান। তাঁরা একে অপরকে মূল্যবান উপহার পাঠাতেন। এখান থেকেই ইংল্যান্ডের রাজা অফ্ফা রেক্স তৎকালীন সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে কিছু সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি এই মুদ্রাটি তৈরি করেছিলেন মুসলিমদের সঙ্গে বাণিজ্যকে চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যে। এছাড়া তাঁর লক্ষ্য ছিল মুসলিম বিশ্বে মুদ্রাটির গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা; কারণ সে সময় মুসলিমরা ক্রুশ চিহ্নের ছবি সংবলিত মুদ্রা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাত। এব্যাপারে ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ব্লান্ট যেসব যুক্তি উত্থাপন করেছিলেন, এটি তার মধ্যে অন্যতম।

গবেষক জের বাখারাচ এবং শরিফ আনোয়ারের “ইসলামী মুদ্রার মর্যাদা: অষ্টম শতাব্দীতে ইসলামী দিনারের ইংরেজ অনুকরণ” শীর্ষক গবেষণা অনুযায়ী, খলিফা মনসুরের আব্বাসীয় দিনার অনুকরণ করার পেছনে রাজা অফ্ফার সিদ্ধান্তের মূল রহস্য লুকিয়ে আছে “মর্যাদাপূর্ণ অনুকরণ” (Prestigious Imitation) নামক ধারণার মধ্যে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ঐ সময়টাতেই সেসব অঞ্চলে ইসলামী স্বর্ণমুদ্রাগুলোর আবির্ভাব ঘটেছিল। উত্তর ইতালির বিভিন্ন অংশসহ অ্যাংলো-স্যাক্সন ইংল্যান্ড ও ক্যারোলিনজিয়ান সাম্রাজ্যের মতো স্থানগুলোতে “Mancus” নামক একটি পরিভাষা ব্যবহৃত হতো—যা মূলত আরবি শব্দ ‘মানকুশ’ (খোদাইকৃত) থেকে এসেছে।

নির্ভরযোগ্য মধ্যযুগীয় উৎসসমূহের তথ্যানুযায়ী, অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে ইতালির ভেনিস, রোম ও মিলানসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ল্যাটিন নথিপত্রে ‘Mancus’ শব্দটি ১০০ বারেরও বেশি পাওয়া গেছে। এসব তথ্য থেকে এটিই প্রমাণিত হয় যে, সে সময় ইতালিতে আরবি স্বর্ণমুদ্রাগুলো বহুল পরিচিত ছিল এবং নির্দিষ্ট কিছু লেনদেনে এগুলো ব্যবহৃত হতো।

ইসলামী রীতিতে তৈরি এই স্বর্ণমুদ্রা বা দিনারগুলো তখন মূল্যের একটি স্বীকৃত মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হতো। এগুলো ছিল এক ধরণের ‘রিজার্ভ কারেন্সি’, যা বিত্তশালী ব্যক্তিরা তুলনামূলক স্বল্প পরিমাণে নিজেদের কাছে জমা রাখতেন। এই মুদ্রাগুলো মানদণ্ড হিসেবে এতটাই সুপরিচিত ও গ্রহণযোগ্য ছিল যে, এর অবমাননাকারীদের কঠোর শাস্তির সম্মুখীন হতে হতো।

এই কারণেই অষ্টম শতাব্দীর শেষভাগে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে সবচেয়ে জনপ্রিয় স্বর্ণমুদ্রা ছিল ইসলামি দিনার, যা লাতিন ভাষায় ‘মানকুশ’ নামে পরিচিত ছিল। ফলস্বরূপ, সবাই এই মুদ্রার রীতি অনুসরণ করতে শুরু করে এবং এটি আন্তর্জাতিক দাপ্তরিক লেনদেনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। এই পরিস্থিতির কারণেই রাজা অফ্ফা রোমের পোপকে তাঁর প্রতিশ্রুত বার্ষিক উপহার পাঠানোর ক্ষেত্রে ইসলামি দিনারের আদলে তৈরি মুদ্রা ব্যবহারের পথ বেছে নিয়েছিলেন।


অফ্ফা রেক্স কি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন?

ইসলামি আদলে দিনার তৈরীর পেছনে আরও কিছু ব্যাখ্যা রয়েছে। দিনারটি ব্রিটেনের বদলে রোমে খুঁজে পাওয়ার কারণে কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন, এটি সম্ভবত পোপতন্ত্রের প্রতি এক ধরণের অবজ্ঞা বা বিদ্রূপের বহিঃপ্রকাশ ছিল; কেননা মার্সিয়া ও ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের এই রাজা প্রতি বছর ৩৬৪টি স্বর্ণের দিনার কর হিসেবে প্রদান করতেন। একদিকে রাজা অফ্ফার সাথে চার্চের যাজক ও রোমের পোপের ঐতিহাসিক বিরোধ এবং অন্যদিকে রাজা শার্লমেনের সাথে তাঁর দ্বন্দ্বের কাহিনীকে এই ব্যাখার পেছনে মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়।

ঐতিহাসিক মোস্তফা আল-কান্নানি তাঁর পূর্বোল্লিখিত গ্রন্থে উল্লেখ করেন, অফ্ফার যুগ পরবর্তী সময় থেকে নিয়ে ক্রুসেডের সময়কাল পর্যন্ত পোপতন্ত্র এবং রোমান চার্চের মাঝে যে শত্রুতামূলক অবস্থান ছিল, তাতে এই কথাটি মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয় যে তারা তাদের অনুসারীদের (যেমন অফ্ফার) কাছ থেকে বার্ষিক কর হিসেবে এমন কোনো মুদ্রা গ্রহণ করবে যাতে স্পষ্টভাবে ইসলামি বাণী খোদাই করা আছে। উদাহরণস্বরূপ, ত্রিপোলি ও সিডনের ক্রুসেডার রাজন্যবর্গ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নাম ও হিজরি সন সংবলিত মুদ্রা তৈরি করেছিলেন; কিন্তু নবম লুইয়ের ক্রুসেড অভিযানে অংশ নেওয়া পোপের প্রতিনিধি সেই মুদ্রাগুলো গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এর দ্বারা বোঝা যায়, রোমের পোপতন্ত্র তাদের ক্ষমতার চরম শিখরে থাকা অবস্থায় কোনো খ্রিস্টান রাজার কাছ থেকে কর হিসেবে এমন মুদ্রা গ্রহণ করার সম্ভাবনা খুবই কম যা এই ধরণের ইসলামি বাণী বহন করে—যদি না সেই রাজা অন্য কোনো ধর্ম গ্রহণ করে থাকেন।

তাওহিদের বাণী সম্বলিত রাজা অফ্ফার এই স্বর্ণমুদ্রার তৈরির ধরণ মাগরিব (উত্তর আফ্রিকা) বা আন্দালুসের (স্পেন) দিনারের চেয়ে বাগদাদের আব্বাসীয় দিনারের সাথে অনেক বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। এর দ্বারা বোঝা যায়, আব্বাসীয় কর্তৃপক্ষের সাথে অফ্ফার নিবিড় সম্পর্ক ছিল এবং অষ্টম শতাব্দীতে দুই পক্ষের পারস্পরিক বাণিজ্যিক সম্পর্কের ভিত্তিতে তিনি মুসলিম বণিকদের পণ্য বিনিময়ের জন্য ব্রিটেনে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছিলেন।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাংলো-স্যাক্সন মুদ্রাতত্ত্বের অধ্যাপক রোরি নেস্মিথ তাঁর “প্রাক মধ্যযুগে ইংল্যান্ড থেকে প্রাপ্ত ইসলামি মুদ্রা” শীর্ষক গবেষণায় অ্যাংলো-স্যাক্সন ব্রিটেনে ইসলামি মুদ্রার অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছেন

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাংলো-স্যাক্সন মুদ্রাতত্ত্বের অধ্যাপক রোরি নেস্মিথ তাঁর “প্রাক মধ্যযুগে ইংল্যান্ড থেকে প্রাপ্ত ইসলামি মুদ্রা” শীর্ষক গবেষণায় অ্যাংলো-স্যাক্সন ব্রিটেনে ইসলামি মুদ্রার অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছেন। বর্তমানে বিভিন্ন সংগ্রহশালায় ১১০০ খ্রিস্টাব্দের পূর্ববর্তী সময়ের প্রায় ১৭৩টি ইসলামি রৌপ্য ও স্বর্ণমুদ্রা সংরক্ষিত আছে, যা তৎকালীন শক্তিশালী ও সুদৃঢ় ইসলামি-ইংরেজ বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের এক অকাট্য প্রমাণ।

সম্ভবত এই কারণেই ডক্টর মোস্তফা আল-কান্নানি মনে করেন যে, রাজা অফ্ফা রোমের পোপতন্ত্রের কাছে পাঠানোর জন্য তাওহিদ খচিত যে স্বর্ণমুদ্রাটি তৈরি করেছিলেন, তা মূলত তাঁর ইসলাম গ্রহণের একটি সুস্পষ্ট দলিল। আর এটি সম্ভব হয়েছিল সেইসব মুসলিম বণিকদের মাধ্যমে, যাঁদের জন্য তিনি ব্রিটেনের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন।

কান্নানি বলেন: “মুসলিম বণিকরা কেবল ব্যবসায়ীই ছিলেন না, বরং তাঁরা ছিলেন ইসলামের দাঈ বা প্রচারক; যাঁরা ফিকহ (ইসলামি আইন), দাওয়াহ এবং শরিয়াহর মূলনীতি সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রাখতেন। তাঁদের উত্তম চরিত্র, সঠিক আচরণ, সততা ও বিশ্বস্ততার কারণে তাঁরা আদর্শ মুসলিমের এক প্রকৃত দৃষ্টান্ত ছিলেন। ফলস্বরূপ, এই বড় ব্যবসায়ীদের কয়েকজনের সাথে অফ্ফার সরাসরি যোগাযোগের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সম্ভবত আব্বাসীয় দিনারে খোদাই করা তাওহিদের বাণীগুলো অফ্ফার মনে কৌতূহল জাগিয়েছিল এবং তিনি তাঁদের সাথে এসব বিষয়ের মর্মার্থ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।”

ধারণা করা হয় যে, এই আলোচনাগুলোর ফলেই শেষ পর্যন্ত রাজা অফ্ফাকে তারা ইসলামের পথে আহ্বান করা সম্ভব হয়েছিলো। তার দরবারে খ্রিস্টধর্ম সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলত। বিষয়টা জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর নেতৃত্বে আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী মুসলিমরা খ্রিস্টান রাজা নাজ্জাশীকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। সম্ভবত এই বণিকরাও রাজা অফ্ফার ক্ষেত্রে অনুরূপ সাফল্য অর্জন করেছিলেন। হতে পারে শুরুতে তিনি একাকী অথবা তাঁর পরিবার ও উচ্চপদস্থ সহযোগীদের নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে এই মুদ্রা তৈরির সিদ্ধান্ত নেন—যার কিছু অংশ তিনি আগের মতোই রোমের পোপতন্ত্রের কাছে কর হিসেবে পাঠিয়েছিলেন।

আল-কান্নানি উল্লেখ করেন— এই দাবির একটি বড় প্রমাণ হলো, রাজা অফ্ফার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ব্রিটিশ রাজাদের সব দলিলাদি সংরক্ষিত থাকলেও তার আমলের নথিপত্র বা দলিলাদি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে গেছে!

তাছাড়া মুসলিম বণিকদের পক্ষে এই ভূমিকা পালন করা মোটেও আশ্চর্যজনক নয়; কারণ তাঁরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারত মহাসাগরের বিভিন্ন দেশ ও দ্বীপে এবং পূর্ব, পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অত্যন্ত সফলতার সাথে এটি করে দেখিয়েছেন। ইসলামি ভূগোলশাস্ত্রের গ্রন্থগুলো থেকে জানা যায় যে, মুসলিমরা ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলেন। প্রখ্যাত ভূগোলবিদ আল-ইদ্রিসি তাঁর বিশ্বকোষ ‘নুজহাতুল মুশতাক ফি ইখতিরাকিল আফাক’-এ ‘ইনকালতারা’ (ইংল্যান্ড) দ্বীপের কথা উল্লেখ করেছেন এবং তৎকালীন প্রধান শহরগুলোর বিবরণ দিয়েছেন। এর মধ্যে লন্ডনও ছিল, যাকে তিনি ‘লুন্দরাস’ নামে অভিহিত করেছেন এবং এটি ‘নাতানজাহ’ নদীর তীরে অবস্থিত বলে উল্লেখ করেছেন, যা বর্তমানে টেমস নদী নামে পরিচিত। ব্রিটেনের ভূগোল সম্পর্কে ইদ্রিসির এই গভীর জ্ঞান এবং শহরগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্ব ও মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি সম্পর্কিত তথ্যগুলো নিঃসন্দেহে তাঁর পূর্ববর্তী পাঁচ শতাব্দীর মুসলিমদের অভিজ্ঞতারই ফসল; এর পাশাপাশি তাঁর তৈরি করা বিশেষ বৈজ্ঞানিক কমিটির তথ্যও এতে সহায়ক ছিল।

১২০০ বছর আগের একটি ব্রিটিশ স্বর্ণমুদ্রায় তাওহিদের বাণীর উপস্থিতি নিয়ে ঐতিহাসিকদের ব্যাখ্যা যাই হোক না কেন—চাই তা ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে ইসলামি মুদ্রার শক্তি ও গ্রহণযোগ্যতার কারণে ‘মানকুশ’ দিনারকে অনুকরণ করার স্বপক্ষেই হোক, কিংবা রাজা অফ্ফার ইসলাম গ্রহণের প্রবল সম্ভাবনার পক্ষেই হোক (কেননা একজন খ্রিস্টান ইউরোপীয় রাজা পোপের কাছে পাঠানো বার্ষিক করের মুদ্রায় তাওহিদের বাণী খোদাই করবেন, এটি তাঁর মুসলিম হওয়া ছাড়া কল্পনা করা কঠিন)—ব্যাখ্যা যা-ই হোক না কেন, এই দিনারের কাহিনী একটি বিষয়কে সন্দেহাতীতভাবে নিশ্চিত করে। তা হলো, আব্বাসীয় যুগে—বিশেষ করে আবু জাফর মনসুর, হাদি, মাহদি, হারুনুর রশিদ এবং মামুনের শাসনামলে—বিশ্বমঞ্চে ইসলামি রাষ্ট্রের সুদৃঢ় অবস্থান ও প্রচণ্ড প্রতাপ ছিল। এর পরবর্তী শতাব্দীতে এমনকি রাশিয়ার কিছু রাজাকেও আব্বাসীয় খলিফাদের কাছে ধর্মপ্রচারক, চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ পাঠানোর জন্য সাহায্য প্রার্থনা করতে দেখি, যার বর্ণনা ব্যাপকভাবে পাওয়া যায় ইবনে ফাদলানের বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনীতে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা আরবি। মূল :  মুহাম্মদ শাবান আইয়ূব