আনুষ্ঠানিকভাবে গত সোমবার কাসসাম ব্রিগেড তাদের মুখপাত্র আবু উবায়দার শাহাদাতের ঘোষণা দিয়েছে। গত দুই বছর ধরে ‘তুফানুল আকসা’ অভিযানের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে প্রতিদিনই বিশ্বজুড়ে মানুষ তাঁর বক্তব্যের অপেক্ষায় থাকত।
কাসসাম ব্রিগেডের বিবৃতিতে আবু উবায়দাকে আখ্যায়িত করা হয়েছে ‘উম্মাহর বজ্রকণ্ঠ, ফিলিস্তিন ও কুদসের কণ্ঠস্বর, প্রতিরোধের স্পন্দন, কাসসাম ব্রিগেডের মিডিয়া শাখার প্রধান এবং মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে গভীর ছাপ রেখে যাওয়া এক অনন্য ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে।
এই প্রেক্ষাপটে আবু উবায়দাকে ঘিরে উঠে এসেছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
১. আবু উবায়দার প্রকৃত পরিচয় কী?
এই প্রথমবারের মতো কাসসাম ব্রিগেড তাদের মুখপাত্রের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করল। দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের হত্যার তালিকায় থাকায় নিরাপত্তাজনিত কারণে তাঁর আসল নাম এতদিন গোপন রাখা হয়েছিল।
গতকাল সোমবার কাসসাম ব্রিগেড জানায়, আবু উবায়দার প্রকৃত নাম হুযাইফা সামির আবদুল্লাহ আল-কাহলুত। তাঁর কুনিয়াত ছিল আবু ইব্রাহিম।
নাম প্রকাশের পাশাপাশি, কাসসাম ব্রিগেড প্রথমবারের মতো মুখোশ ছাড়া আবু উবায়দার একটি ছবিও প্রকাশ করেছে।
২. কবে এবং কীভাবে আবু উবায়দা শহীদ হন?
হামাসের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, বিশ্বাসঘাতক ও কাপুরুষোচিত জায়নবাদী বিমান হামলায় আবু উবায়দা শাহাদাত বরণ করেন। কাসসাম ব্রিগেডের মিডিয়া ব্যবস্থাকে দৃঢ়তা ও দক্ষতার সঙ্গে নেতৃত্ব দেওয়ার পর তিনি আল্লাহর ডাকে সাড়া দেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, আবু উবায়দা ও তাঁর সহযোদ্ধারা এমন এক গৌরবময় ভূমিকা পালন করেছেন, যা বন্ধু ও শত্রু উভয় পক্ষই প্রত্যক্ষ করেছে। তাঁর নেতৃত্বে বিশ্ব দেখেছে ‘তুফানুল আকসা’ অভিযানের ধারাবাহিক চিত্র তা। একই সঙ্গে গাজার মুজাহিদদের সেই অসামান্য বীরত্ব, যা বিশ্বকে বিস্মিত করেছে এবং দখলদার বাহিনীকে ক্ষুব্ধ করেছে।
অন্যদিকে, গত ৩০ আগস্ট ইসরায়েল দাবি করে, গাজা শহরে চালানো এক বিমান হামলায় আবু উবায়দাকে হত্যা করা হয়েছে। সে সময় ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাতস বলেন, গাজায় আবু উবায়দাকে লক্ষ্যবস্তু করে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছে ইসরায়েল।
এরপর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শাবাক এক যৌথ বিবৃতিতে তাঁকে হত্যার দাবি করে। তবে সে সময় হামাস এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক কোন বিবৃতি দেয়নি, আবার সরাসরি অস্বীকারও করেনি।
৩. কমান্ডার আবু উবায়দার পরিবারের পরিণতি কী হয়েছিল?
হামাস জানিয়েছে, জায়নবাদী ইসরায়েলি বিমান হামলায় আবু উবায়দা তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে শাহাদাত বরণ করেন। আল্লাহ তাঁদের সবাইকে রহম করুন। সংগঠনটি বলেছে, এটাই ছিল সেই বরকতময় পরিণতি, যা তিনি নিজেই কামনা করেছিলেন এবং যে পথে তিনি অটল ছিলেন। গাজার মাটিতে জিহাদ, ত্যাগ, ধৈর্য ও অবিচল প্রতিরোধে ভরা দীর্ঘ জীবনের পর ‘তুফানুল আকসা’ যুদ্ধে তিনি আল্লাহর বিশেষ নির্বাচনে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেন।
৪. মুখোশধারী এই নেতার সামরিক জীবন কেমন ছিল?
কাসসাম ব্রিগেডের ভাষ্য অনুযায়ী, শহিদ আবু উবায়দার সামরিক জীবন প্রায় ২০ বছর বিস্তৃত ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি শত্রুপক্ষকে বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছেন এবং মুমিনদের হৃদয়ে সাহস ও আস্থার সঞ্চার করেছেন।
২০০৬ সালের ২৫ জুন তিনি প্রথম বড় পরিসরে আলোচনায় আসেন। সেদিন তিনি ‘আল-ওহমুল মুতাবাদ্দিদা’ অভিযানের ঘোষণা দেন। ওই অভিযানে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হয় এবং সেনা গিলাদ শালিত আটক হয়।
বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ সাল থেকেই তিনি কাসসাম ব্রিগেডের একজন মাঠপর্যায়ের শীর্ষ কর্মী হিসেবে গণমাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন। তবে তিনি কখনো প্রকাশ্যে মুখ দেখাননি। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকতেন। ২০০৬ সালের পর তিনি কাসসাম ব্রিগেডের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্রের দায়িত্ব পান।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘তুফানুল আকসা’ অভিযানের পর আরব ও মুসলিম বিশ্বজুড়ে তাঁর পরিচিতি ও প্রভাব বহুগুণে বেড়ে যায়। গত দুই বছর ধরে প্রায় প্রতিদিনই তিনি বিশ্ববাসীর উদ্দেশে প্রতিরোধ বাহিনীর সামরিক অভিযান ও বিভিন্ন ফ্রন্টের পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন।
৫. গাজার কোন অঞ্চলের সন্তান ছিলেন আবু উবায়দা?
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, আবু উবায়দার শিকড় গাজার নালিয়া গ্রামে, যা ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল দখল করে নেয়। তিনি গাজার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জাবালিয়ায় বসবাস করতেন।
২০০৮, ২০১২ ও ২০১৪ সালে তাঁর বাড়িতে একাধিকবার ইসরায়েলি হামলা চালানো হয়। ‘তুফানুল আকসা’ যুদ্ধকালেও তাঁর বাড়ি আবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়।
৬. তাঁর শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি কেমন ছিল?
বিভিন্ন ফাঁস হওয়া তথ্যে জানা যায়, আবু উবায়দা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছিলেন এবং ২০১৩ সালে গাজার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের উসুলুদ্দিন বিভাগ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমানদের পবিত্র ভূমি’। একই বিষয়ে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রির প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন।
যোগাযোগ ও বক্তব্য উপস্থাপনায় তাঁর ছিল সুস্পষ্ট দক্ষতা। ব্যক্তিত্বের রহস্যময়তা ও নির্দিষ্ট পোশাক তাঁকে আলাদা এক ধরনের অনন্যতা দিয়েছে। বক্তব্যে তিনি নমনীয়তা ও দৃঢ়তার সমন্বয় ঘটাতেন। কণ্ঠস্বরের ওঠানামা, হাতের ইশারা ও আঙুলের ভঙ্গির মাধ্যমে তিনি বার্তাকে আরও প্রভাবশালী করে তুলতেন। সামরিক ও রাজনৈতিক তথ্য তিনি অগ্রাধিকার অনুযায়ী সংক্ষিপ্ত, নির্ভুল ও আবেগহীনভাবে উপস্থাপন করতেন।
সূত্র: আল জাজিরা











