গাজায় ১৫ মাসের ইসরায়েলি বর্বরতার পরিসংখ্যান

গাজায় ১৫ মাসের ইসরায়েলি বর্বরতার পরিসংখ্যান
গাজায় ১৫ মাসের ইসরায়েলি বর্বরতার পরিসংখ্যান। ছবি : আনাদোলু

ব্রিটিশ সংবাদপত্র গার্ডিয়ান তাদের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে ইসরায়েলের ১৫ মাসব্যাপী যুদ্ধের ফলে গাজায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র। এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত গাজার বেসামরিক জনগোষ্ঠী, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, শিক্ষা খাত, কৃষি ও অবকাঠামোর ওপর এক দীর্ঘস্থায়ী ধ্বংসাত্মক প্রভাব রেখে গেছে।

যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির সংক্ষিপ্ত চিত্র:

হতাহতদের পরিসংখ্যান

ইসরায়েলের হামলায় ৪৬,৭০৭ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন, যা গাজার যুদ্ধ-পূর্ব জনসংখ্যার ২%। অর্থাৎ প্রতি ৫০ জনে একজন শহিদ হয়েছে।

শিশু শহীদ : নিহতদের মধ্যে ১৩,৩১৯ জন শিশু, যাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটটির বয়স ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টা।

বয়স্ক শহীদ: নিহতদের মধ্যে একজনের বয়স ছিল ১০১ বছর।

ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে আছে : আনুমানিক ১০,০০০ মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে রয়েছেন। সরঞ্জামের অভাবে তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

আহত: ১,১০,২৬৫ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে এক-চতুর্থাংশ পঙ্গুত্ব, পোড়া ক্ষত বা মাথার আঘাতের মতো স্থায়ী শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে গুরুতর আঘাতে নিহতদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, অক্টোবর ২০২৪ পর্যন্ত প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা ৭০,০০০ ছাড়িয়ে গেছে।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিপর্যয়

ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে।

হাসপাতালে হামলা: ৬৫৪টি হামলা চালানো হয়েছে চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর ওপর।

স্বাস্থ্যকর্মীদের মৃত্যু: ১,০৬০ জন চিকিৎসক, নার্স ও চিকিৎসা সহায়ক নিহত হয়েছেন।

সচল হাসপাতাল: ৩৬টি হাসপাতালের মধ্যে যুদ্ধ শেষে মাত্র ১৭টি আংশিকভাবে চালু ছিল।

রোগের প্রাদুর্ভাব: ২০২৪ সালে শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণে ১২ লক্ষ এবং ডায়রিয়ায় ৫.৭ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে।

শিক্ষা ব্যবস্থার বিপর্যয়

ইসরায়েলি হামলায় গাজার শিক্ষাখাতও চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুল: ৫৩৪টি স্কুল পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছে, যা গাজার মোট স্কুলের ৯৫%।

শিক্ষা থেকে বঞ্চিত শিশু: প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে চলে গেছে ৬,৬০,০০০ শিশু।

গৃহহীনতা ও বাসস্থান সংকট

ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ি: ৪৩৬,০০০ ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে। এটি মোট ঘরবাড়ির ৯২%।

বাস্তুচ্যুত মানুষ: ১.৯ মিলিয়ন মানুষ (গাজার মোট জনসংখ্যার ৯০%) তাদের বাসস্থান হারিয়েছে।

খাদ্য সংকট ও অপুষ্টি

গাজায় ইসরায়েলি অবরোধ এবং কৃষি উৎপাদনের ব্যাপক ক্ষতি খাদ্য সংকটকে আরও তীব্র করেছে।

অপুষ্টি: ৯৬% নারী ও শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছেন না।

খাদ্য সংকট: ৩,৪৫,০০০ মানুষ চরম খাদ্য সংকটে, এবং ৮,৭৬,০০০ মানুষ মারাত্মক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

কৃষি ক্ষতি: গাজার ৪০% কৃষিজমি ধ্বংস হয়েছে, এবং অর্ধেক গাছপালা কেটে ফেলা হয়েছে।

পরিবেশগত বিপর্যয়

পানি ও মাটি দূষণ: ইসরায়েলের অস্ত্রের বিষাক্ত বর্জ্যে মাটি ও পানির মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে।

গাছপালা ধ্বংস: গাজার অর্ধেকের বেশি গাছপালা কেটে ফেলা হয়েছে।

পানির ট্যাঙ্ক ধ্বংস: ৫৪টি পানির ট্যাঙ্কের মধ্যে ৩১টি ধ্বংস হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

অপুষ্টি ও খাদ্য সংকটের কারণে শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ চিরতরে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবেশের ক্ষতির ফলে গাজার বাস্তুসংস্থান এবং জনজীবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান:

মৃত্যু: ৪৬,৭০৭ জন

শিশু শহীদ: ১৩,৩১৯ জন

আহত: ১,১০,২৬৫ জন

ধ্বংস হওয়া বাড়িঘর: ৪৩৬,০০০

ধ্বংস হওয়া স্কুল: ৫৩৪টি

বাস্তুচ্যুত জনসংখ্যা: ১.৯ মিলিয়ন

স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা: ৬৫৪টি

ইসরায়েলের এই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ গাজা উপত্যকায় এক নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মৃতদেহ, ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো এবং অপুষ্টিতে ভুগতে থাকা শিশুদের ছবি আজ গোটা বিশ্বের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই যুদ্ধের ক্ষত গাজার জনগণের জন্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করতে হবে।

আরো পড়ুন

বিজ্ঞাপন