যেমন হতে পারে ২০২৬ সালের পৃথিবী

জাপান-চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যকার শীতল সম্পর্ক এশিয়াকে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক এক রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে।
ছবি : এআই
ছবি : এআই

পূর্ব থেকে পশ্চিম—পুরো বিশ্ব আজ সংকটের আবর্তে দুলছে। ৬১ বছরের বাথ পার্টির একনায়কতন্ত্র আর ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে আসা সিরিয়া আজ একটু বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে; কিন্তু তাকে শান্তিতে থাকতে দেওয়া হচ্ছে না।

গাজাকে গত দুই বছর ধরে প্রায় ২ লক্ষ টন বোমার আঘাতে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেখানে প্রাণ হারিয়েছেন কয়েক লাখ মানুষ; সেই গাজা আজ এক ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি আর ক্ষীণ আশার শান্তিচুক্তির ওপর ভর করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু সেখান থেকেও শকুনদের দৃষ্টি সরছে না।

তুরস্ক গত ৪০ বছর ধরে যে সন্ত্রাসবাদের দংশন সইছে, তা শেষ করে সহিংসতামুক্ত এক অঞ্চলের স্বপ্ন দেখছে; কিন্তু সেই স্বপ্ন ধূলিসাৎ করার চক্রান্তকারীরাও সক্রিয়।

বিশ্ব প্রতিদিন একটু একটু করে এক অন্ধকার, শীতল ও রহস্যময় ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে। একদিকে নিজেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত দরিদ্র মানুষের বিদ্রোহ, অন্যদিকে অতৃপ্ত ও লোভী ধনীদের অবিরাম আগ্রাসন; বিশ্ব যেন এই দুই মেরুর যাঁতাকলে পিষ্ট।

আফ্রিকা, যাকে দশকের পর দশক উপনিবেশবাদের তিক্ত স্বাদ গ্রহণ করতে হয়েছে, যাদের সন্তানদের দাস বানানো হয়েছে, নিজ ভূমি থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে; তারা আজ মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু অভিশপ্ত সোনার লোভে নিকৃষ্ট সব গোপন পরিকল্পনার মাধ্যমে তাদের বারবার সেই যন্ত্রণার বৃত্তে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নিহতের সঠিক সংখ্যা কারো জানা নেই—কেউ বলে পাঁচ লক্ষ, কেউ বলে দশ। তবে সংখ্যার ঊর্ধ্বে সত্য এই যে, এই যুদ্ধ ইউরোপ থেকে আফ্রিকা, এশিয়া থেকে আমেরিকা, পুরো বিশ্বকে তটস্থ করে রেখেছে। যারা যুদ্ধ থামাতে চায়, তাদের চেয়ে যুদ্ধ টিকিয়ে রাখতে চাওয়া লর্ডেরা অনেক বেশি শক্তিশালী। মৃত্যু আর হাহাকার সেখানে অন্তহীন।

ল্যাটিন আমেরিকা আজ আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে। তাদের উপকূলের দিকে ধেয়ে আসা যুদ্ধজাহাজ আর আকাশে উড়তে থাকা মরণাস্ত্রের ছায়ার নিচে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ খুঁজছে।

ইউরোপের অর্থনীতি আজ সংকুচিত, রাজনৈতিক প্রভাব ম্লান, চিন্তাধারা সীমাবদ্ধ। চরম ডানপন্থীদের চাপে দিশেহারা ইউরোপ আজ ‘রুশ হুমকির’ ভয়ে কাঁপছে এবং যেন কোনোমতে টিকে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

এশিয়া-ও মধ্যপ্রাচ্যের চেয়ে কম অস্থির নয়। ভারত-পাকিস্তান, আফগানিস্তান-পাকিস্তান, চীন-তাইওয়ান কিংবা কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ডের মতো অঞ্চলগুলোতে উত্তেজনা বিরাজমান এবং মাঝে মাঝেই সেখানে সংঘাতের আগুন জ্বলে উঠছে। জাপান-চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যকার শীতল সম্পর্ক এশিয়াকে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক এক রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে।

মুসলিম বিশ্বের শাসকেরা আজ চরম উত্তেজনা আর এক গভীর অক্ষমতার গহ্বরে নিমজ্জিত। ছয়টি দেশের ওপর ইসরায়েলি আগ্রাসনের পরেও তারা স্থবির। নিজেদের চিন্তাধারাকে আরো কৌশলী ও আধুনিক করা কিংবা আযাদির নতুন পথ খোঁজার বদলে তারা আজ কেবল নিজেদের ব্যর্থতার বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে, তাবেদারির পথ বেছে নিচ্ছে।

মোদ্দাকথা, আমরা এমন এক কঠিন সময় পার করছি, যার সামনে কি আছে প্রেডিক্ট করা হয়ে উঠছে জটিল থেকে জটিলতর। এমন এক বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছি যা হয়তো অত্যন্ত সংঘাতময় হয়ে উঠবে।

আগামী বছর আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে?

আগামী বছর সিরিয়াকে একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র গঠন, ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অবসান এবং কুর্দি, দ্রুজ ও নুসাইরিদের (আলাউই) কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ভাগ্যনির্ধারক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তুরস্ককে দেশ থেকে সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে। তবে তারা একটি কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, বিশেষ করে যখন পিকেকে (PKK) যোদ্ধারা দেশে ফিরে আসবে কিংবা কারাগার থেকে তাদের মুক্তি দেওয়া হবে।

গাজায় এখন ট্রাম্পের পরিকল্পনার দ্বিতীয় পর্যায়ে উত্তরণ অনিবার্য; শহরের পুনর্গঠন এবং মানবিক বিপর্যয়ের অবসান ঘটাতে আগামী বছর গ্যারান্টি প্রদানকারী দেশসমূহ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ মানবিক প্রয়োজন হয়ে দাড়িয়েছে।

অন্যদিকে সুদান, সোমালিয়া এবং ইয়েমেনে চলমান গৃহযুদ্ধ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে এটি আর দীর্ঘায়িত হওয়া সম্ভব নয়। লাশের মিছিল, নগরীর ধ্বংসস্তূপ, অর্থনীতির ধস এবং গণ-উদ্বাস্তু হওয়ার যে চড়া মূল্য এই অঞ্চলকে দিতে হচ্ছে, তা আগামী বছরে কোনো এক চূড়ান্ত পরিণতির দিকে মোড় নিতে বাধ্য।

যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এবং ইউরোপের একগুঁয়েমির মুখে ইউক্রেন এখন আর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে না। তাদের জনবল ফুরিয়ে আসছে, প্রতিরোধের শক্তি ক্ষীণ হয়ে পড়েছে এবং রণক্ষেত্রে তারা বিশাল এলাকা হারিয়েছে। এখন ইউরোপ ও আমেরিকাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা কি এই দেশটিকে শেষ পর্যন্ত লড়তে লড়তে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে, নাকি আত্মসমর্পণে বাধ্য করবে। এই ভাগ্যনির্ধারক চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি আগামী বছরেই হয়তো নেওয়া হবে।

ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়া, নিকারাগুয়া এবং এল সালভাদরের মতো ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো এখন আর মার্কিন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ সইতে পারছে না। তাদের সামনে এখন দুটি পথ খোলা: হয় আমেরিকার ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করবে, নতুবা অস্ত্রের মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নিতে হবে—যা হবে অত্যন্ত সংঘাতময় ও দুর্ভাগ্যজনক।

ইউরোপকেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে হবে। মনে হচ্ছে তারা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছাই পালন করবে, যার ফলে বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চ থেকে ইউরোপের প্রভাব পুরোপুরি বিলুপ্ত হবে। ‘রুশ হুমকির’ ভয়ে ইউরোপ আতঙ্কিত হয়ে যা কিছু করেছে, তা বুমেরাং হয়ে তাদের ওপরই আঘাত হানবে। শেষ পর্যন্ত ইউরোপ চরম ডানপন্থীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একদল বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রের জোটে পরিণত হবে। আগামী বছর থেকেই এই পরিবর্তনের প্রাথমিক লক্ষণগুলো আমরা দেখতে শুরু করব।

এশিয়ার প্রতিটি ভূ-রাজনৈতিক ফাটল আজ অত্যন্ত সংবেদনশীল; সেখানে বর্তমানে ছোট ছোট সংঘর্ষ (মৃদু ভূকম্পনের মতো) চলছে। আশঙ্কা হয়, আগামী বছর সেখানে এক ‘মহা-ভূমিকম্প’ বা বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হতে পারে। আমরা মনেপ্রাণে চাই, যেন আমাদের এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়, কিন্তু এশিয়া যে বিশ্বের নতুন উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হতে যাচ্ছে, সেই পূর্বাভাসে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।

প্রযুক্তি জগতের এই লোভী দানবরা আর কতকাল বিশ্বকে এভাবে লুণ্ঠন করবে? প্রযুক্তিতে উন্নত কেবল তুরস্কেই বিজ্ঞাপনের বাজারের ৭৫ শতাংশ দখল করে রেখেছে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো। যারা ই-কমার্স করেন, তাদের লাভের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ‘বিজ্ঞাপন’ বাবদ এই কোম্পানিগুলোর পকেটে চলে যায়। সম্পদ বণ্টনের এই চরম বৈষম্য পুরো বিশ্ব জুড়েই বিদ্যমান, যা একটি বিপ্লব ঘটানোর জন্য যথেষ্ট। আমরা যে অস্থিরতা দেখছি, তার মূলে রয়েছে শোষক এবং শোষিতের এই চিরন্তন দ্বন্দ্ব।

ইসরায়েল কখনোই গাজায় শান্তি বা স্থিতিশীলতা ফিরতে দেবে না। তেমনি লেবানন, ইয়েমেন, সিরিয়া বা ইরানে মানুষ শান্তিতে থাকুক—মডারেট দুনিয়া এবং তার দাসদের কেউ সেটা চায় না। একারণেই সেখানে প্রতিনিয়ত এসেসিনেশন, বোম্বিং আর সংঘাতের উসকানি দেওয়া হচ্ছে। তারা মনে করছে এসব করে তারা নিজেরা নিরাপদ থাকবে, কিন্তু এটি তাদের ভুল ধারণা। ইসরায়েল এই আচরণের মাধ্যমে আসলে বিশ্বের সর্বত্র ইহুদিদের জীবনকেই ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বকে তাদের নিজ অঞ্চলের স্বার্থে এখন থেকেই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আগামী বছরই হতে হবে সেই যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ।

আগামী বছরটি হবে কঠিন সব সিদ্ধান্ত গ্রহন এবং নতুন সংকটের বছর। হয়তো এই লেখাটি কিছুটা হতাশাজনক মনে হতে পারে। তবে পৃথিবী যেকোনো মুহূর্তে বদলে যেতে পারে, তাই আমার লেখার খারাপ আশঙ্কাগুলো সঠিক না হলেই বরং আমি খুশি হব। আগামী বছরের শেষে আমরা এই লেখাটি আবার খুলে দেখব এবং মিলিয়ে নেব—কতটা বাস্তবায়িত হলো আর কতটা হলো না।