ইয়েমেনের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং অস্থির। দীর্ঘদিন ধরে চলমান গৃহযুদ্ধের পর সম্প্রতি ২০২৫ সালের শেষ দিকে এসে দেশটিতে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটছে। বর্তমানে ইয়েমেন মূলত তিনটি প্রধান শক্তির মধ্যে বিভক্ত, যার ফলে দেশে একক কোনো কার্যকর সরকার নেই।
প্রধান কতটি পক্ষ বা সরকার?
বর্তমানে ইয়েমেনে তিনটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও সামরিক পক্ষ সক্রিয় রয়েছে:
- প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল (PLC): এটি জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বৈধ সরকার। সৌদি আরবের সমর্থনে গঠিত এই কাউন্সিল বর্তমানে এডেন (Aden) শহর থেকে কাজ করার চেষ্টা করছে, তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে তাদের নিয়ন্ত্রণ বেশ সংকুচিত হয়েছে।
- হুতি বিদ্রোহী (আনসুরুল্লাহ আল হুথি): উত্তর ইয়েমেনের বিশাল অংশ এবং রাজধানী সানা এদের দখলে। এরা ইরান সমর্থিত এবং নিজেদের বৈধ সরকার হিসেবে দাবি করে।
- সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (STC): সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি দক্ষিণ ইয়েমেনকে একটি আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যদিও তারা আগে PLC সরকারের অংশ ছিল, কিন্তু ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তারা প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করে বিশাল এলাকা দখল করে নিয়েছে। দেশের প্রায় অর্ধেকের বেশি অঞ্চল তাদের নিয়ন্ত্রণে।
নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা ও কৌশলগত গুরুত্ব
বলতে গেলে ইয়েমেন এখন উত্তর ও দক্ষিণে দ্বিখণ্ডিত। হুতিরা উত্তর ও পশ্চিমের জনবহুল এলাকাগুলো শাসন করছে, যার মধ্যে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ হুদায়দাহ বন্দর অন্তর্ভুক্ত। এই বন্দরটি ব্যবহার করে তারা বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান নৌপথে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ ও পূর্ব ইয়েমেনের বিশাল মরুভূমি এবং তেল ও গ্যাস সমৃদ্ধ এলাকাগুলো এখন মূলত STC-এর দখলে। বিশেষ করে হাদরামাউত এবং আল-মাহরার মতো বিশাল প্রদেশগুলো দখল করার মাধ্যমে তারা ইয়েমেনের অর্থনীতির চাবিকাঠি নিজেদের হাতে নিয়েছে। সরকারি বাহিনী বর্তমানে কেবল মারিবের মতো কিছু সীমিত পকেটে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।
সাম্প্রতিক সংঘাত ও নাটকীয় পরিবর্তন
২০২৫ সালের শেষার্ধে ইয়েমেনের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি আসে দক্ষিণপন্থি STC-এর সামরিক অভিযানের মাধ্যমে। দীর্ঘদিন পর তারা সরকারি বাহিনীর হাত থেকে একের পর এক প্রদেশ দখল করতে শুরু করে। এই ঘটনাটি ইয়েমেনের যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে বলা যায়। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক জোটের দুই প্রধান অংশীদার সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ। সৌদি আরব ইয়েমেনের অখণ্ডতা রক্ষায় সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিলেও, সংযুক্ত আরব আমিরাত সরাসরি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উসকে দিচ্ছে। সম্প্রতি সৌদি জোট কর্তৃক আমিরাতি জাহাজে বিমান হামলা এবং ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম পরিস্থিতিকে যুদ্ধের ভেতরে আরেক যুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
মোটকথা হলো, ইয়েমেন এখন কার্যত বিভক্তির দ্বারপ্রান্তে। একদিকে হুতিদের উত্তর ইয়েমেন, অন্যদিকে STC-এর দক্ষিণ ইয়েমেন—মাঝখানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ক্ষমতা হারিয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বাড়তে থাকা দ্বন্দ্ব এই সংকটকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।











