ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের ইতিহাসে এক কিংবদন্তিতুল্য নাম আবু উবায়দা। দীর্ঘ দুই দশক ধরে যিনি ছিলেন কাসসাম ব্রিগেডের দাপ্তরিক কণ্ঠস্বর, গত ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে তার শাহাদাতের সংবাদে বিশ্বজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা তুলে ধরছি ছদ্মবেশের আড়ালে থাকা মানুষটি এবং তার কর্মময় জীবনের অজানা কিছু অধ্যায়।
মুখোশের আড়ালে হুজাইফা আল-কাহলুত
যিনি বিশ্বজুড়ে ‘আবু উবায়দা’ নামে পরিচিত ছিলেন, তার আসল নাম হুজাইফা সামির আল-কাহলুত। পারিবারিক এবং সামাজিক পরিমণ্ডলে তিনি ‘আবু ইবরাহিম’ নামেও পরিচিত ছিলেন। একজন দুর্ধর্ষ সামরিক মুখপাত্র হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন উচ্চশিক্ষিত গবেষক।
আরবিতে প্রকাশিত এক ফিচারে আবু উবায়দার এক্স একাউন্ট (সাবেক টুইটার) নিয়ে তথ্য পাওয়া যায়। তাতে দেখা যায়, আবু উবায়দা গাজা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আকিদা ও সমসাময়িক মতবাদ’ বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) ডিগ্রি অর্জন করেন। তার থিসিসের বিষয় ছিল- ‘পবিত্র ভূমি: ইসলাম, ইহুদি ও খ্রিস্টধর্মের সংঘাত ও অবস্থান’ (Holy Land Between Judaism, Christianity, and Islam)।
আবু উবায়দা এই অ্যাকাউন্টে অনেকদিন ধরে অ্যাক্টিভ ছিলেন। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে এক টুইটে তিনি হাসান বসরীর উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছিলেন, ‘কতশত যোদ্ধা আছেন, যারা ময়দানে লড়ছেন কিন্তু কখনও তলোয়ার বহন করেননি’।
২০১২ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে মিশরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বেশ কিছু টুইট করেন, যেখানে তিনি দুর্নীতির সমালোচনা করেন এবং সত্যের পথে অবিচল থাকার আহ্বান জানান।
কাসসাম ব্রিগেডের বাইরের জীবনে তিনি নিজেকে একজন ‘মুসলিম, আরব এবং ফিলিস্তিনি’ হিসেবে পরিচয় দিতেন।
ব্যক্তিগত দর্শন ও পারিবারিক জীবন
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে হুজাইফা আল-কাহলুত ছিলেন অত্যন্ত রুচিশীল এবং দূরদর্শী। নিজের প্রোফাইলের বর্ণনায় তিনি নিজেকে একজন ‘মুসলিম, আরব, আসকালানি, ফিলিস্তিনি’ হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং গাজাকে নিজের জান্নাত ও জেরুজালেমকে নিজের স্বপ্ন হিসেবে উল্লেখ করতেন। ২০১৪ সালে তার বড় ছেলে ইবরাহিম যখন স্কুলে অসামান্য সাফল্য (৯৯.৮ শতাংশ নম্বর) অর্জন করে, তখন একজন স্নেহময় বাবা হিসেবে তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে আবেগঘন পোস্ট দিয়েছিলেন। পারিবারিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে তার ডাকনাম বা উপাধি ছিল আবু ইবরাহিম।
প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর হিসেবে উত্থান
২০০৪ সাল থেকে কাসসাম ব্রিগেডের হয়ে তার পথচলা শুরু হলেও ২০০৬ সালে গিলাদ শালিত বন্দি হওয়ার পর তিনি পাদপ্রদীপে আসেন। সেই থেকে ২০২৪-২৫ সালের ‘তুফানুল আকসা’ অভিযান পর্যন্ত প্রতিটি বড় সামরিক সংঘাতের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ভাষণগুলো তিনিই প্রদান করতেন। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী তাকে দমনে মরিয়া হয়ে কয়েক দফা হত্যার দাবি করলেও তিনি প্রতিবারই সগৌরবে ফিরে এসেছেন। ২০২৫ সালের মে ও আগস্ট মাসেও তার মৃত্যুর খবর ছড়ানো হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত ২৯ ডিসেম্বর সত্য প্রমাণিত হয়।
শেষ বিদায় ও ভাইয়ের শোকবার্তা
২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ আবু উবায়দার বড় ভাই ইবরাহিম আল-কাহলুত এক হৃদয়বিদারক বার্তার মাধ্যমে ভাইয়ের শাহাদাতের খবর নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, জিহাদ এবং জাতির প্রতি সুগভীর দায়ের কারণে হুজাইফা ব্যক্তিগত জীবনে পরিবারের সাথে খুব অল্প সময় কাটাতে পেরেছেন। ভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শোকবার্তায় ইবরাহিম লেখেন, ‘অবশেষে প্রকাশের অনুমতি পাওয়ার পর বলছি, হে আমার প্রিয় ভাই, যদি পারতাম আমাদের জীবনের বিনিময়ে হলেও তোমাকে বাঁচিয়ে রাখতাম। তুমি ছিলে উম্মাহর সম্মান এবং আমাদের অহংকার।’
ভাইয়ের কর্মনিষ্ঠার স্মৃতিচারণ করে তিনি আরও বলেন, ‘জিহাদের পথে তোমার ব্যস্ততা এবং ধর্মীয় ও জাতীয় কর্তব্যের প্রতি তোমার নিষ্ঠার কারণে আমরা দুনিয়াতে তোমাকে খুব কমই কাছে পেয়েছি।’
শোকবার্তার শেষে তিনি দোয়া করেন যেন আল্লাহ তার ভাইকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ স্থানে আসীন করেন।
আবু উবায়দার শাহাদাতের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। তবে তার রণহুঙ্কার এবং সাহসিকতার বীরত্বগাথা ফিলিস্তিনি প্রজন্মের মনে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।











