মধ্যপ্রাচ্য

মধ্যপ্রাচ্য অর্ডার করতে ক্লিক করুন

ইসরায়েলি নজরদারি ও গুপ্তচরবৃত্তির সরঞ্জাম যেভাবে গ্রাস করছে বিশ্বকে

দখলদার ইসরায়েলের অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড মূলত এই প্রযুক্তির প্রথম পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
Israeli-CyberSecurity

 ইসরায়েলি গুপ্তচরবৃত্তি এবং নজরদারি সরঞ্জাম এখন আর কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইসরায়েলি নজরদারি প্রযুক্তি বর্তমানে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে ১০২টি দেশে এই প্রযুক্তি সক্রিয়ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যার মধ্যে এশিয়া শীর্ষে রয়েছে (৩৫টি দেশ), এরপরই ইউরোপ ও আফ্রিকার অবস্থান। আফ্রিকাতে ব্যবহার তুলনামূলক কম-বেশি হলেও স্পষ্ট উপস্থিতি রয়েছে বলা জানা গেছে।

এই নজরদারি শুধু কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যেও এসব প্রযুক্তির ব্যবহার ধরা পড়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম’-এর অজুহাতে এসব সরঞ্জাম ব্যবহৃত হলেও বাস্তবে তা নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় ব্যাপক হস্তক্ষেপ করছে।

ডার্টি টাস্ক’ বা নোংরা অভিযানের প্রযুক্তি (The ‘Dirty Tasks” Technologies)

আরবি পোস্ট-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ইসরায়েলের ডিজিটাল নজরদারি প্যাকেজ এখন আর নিছক বাণিজ্যিক পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি কার্যকর হাতিয়ারে।

এই বিস্তৃত নেটওয়ার্ক বর্তমানে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি দেশে সক্রিয়। অত্যাধুনিক হ্যাকিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর গোপনে গভীর ও লক্ষ্যভিত্তিক নজরদারি চালানো হচ্ছে,। যা প্রায়ই আন্তর্জাতিক আইন ও নজরদারি কাঠামোর বাইরে থেকে পরিচালিত হয়।

হ্যাকিংয়ের জগতের দুই দানব (Giant Hackers)

​ইসরায়েল-ভিত্তিক অত্যন্ত শক্তিশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান NSO Group এবং Cellebrite বর্তমান বিশ্বের সাইবার নজরদারির সবচেয়ে বিপজ্জনক নাম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। NSO-এর তৈরি ‘পেগাসাস’ (Pegasus) সফটওয়্যারটি ৫১টি দেশে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তির কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের কেলেঙ্কারির জন্ম দেয়। অন্যদিকে, Cellebrite কোম্পানিটি ডেটা এক্সট্রাকশন এবং লোকেশন ট্র্যাকিংয়ে বিশেষজ্ঞ। ৫০টি দেশের নিরাপত্তা সংস্থায় তাদের সরঞ্জামের ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে তারা এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।

নেপথ্যে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা (Military Intelligence Fingerprints)

​এই টেক জায়ান্টগুলোর নেপথ্যে রয়েছে ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘ইউনিট ৮২০০’ (Unit 8200)-এর মস্তিষ্ক। এই কোম্পানিগুলোর প্রায় ৮০% উদ্যোক্তাই দেশটির এই অভিজাত টেক ইউনিটের সাবেক সদস্য। এই যোগসূত্র ব্যক্তিগত খাতের সাথে ইসরায়েলি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের এমন এক অবিচ্ছেদ্য ও জৈবিক সম্পর্ক তৈরি করেছে যা আলাদা করা অসম্ভব।

​ফিলিস্তিন: প্রযুক্তির পরীক্ষাগার (Palestine: The Testing Ground)

​দখলদার ইসরায়েলের অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড মূলত এই প্রযুক্তির প্রথম পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানে সাধারণ জনগণের ওপর ফেসিয়াল রিকগনিশন (মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ) এবং ব্যাপক নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। এরপর ইসরায়েলি কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যগুলো মাঠে পরীক্ষিত (Field-tested) হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বিশ্ববাজারে বাজারজাত করে, যা বিশ্বব্যাপী সাইবার সিকিউরিটি মার্কেটে তাদের বিশেষ প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দেয়।

​দুর্বল ও অভিবাসীদের ওপর নজরদারি (Targeting the Vulnerable and Migrants)

​গুপ্তচরবৃত্তির এই থাবা শুধু রাজনীতিবীদদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি ইউরোপ ও আমেরিকার শরণার্থী এবং অভিবাসীদের ওপরও বিস্তৃত হয়েছে। অত্যাধুনিক ভিডিও অ্যানালিটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। গ্রিস এবং ইতালিতে ইসরায়েলি প্রযুক্তি ব্যবহার করে শরণার্থী শিবিরগুলোতে কারাগারের মতো কঠোর নজরদারি পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।

​অর্থনীতি বনাম নিয়ন্ত্রনহীনতা (Economy and Missing Oversight)

​ইসরায়েল যখন তাদের প্রতিরক্ষা রপ্তানিতে ১৪.৭ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড গড়ছে, তখন এই উদ্ভাবনগুলো মূলত একটি আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণহীন শূন্যতার মধ্যে কাজ করছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে নজরদারির পরিধি ক্রমে বেড়েই চলেছে। ইসরায়েলি রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সমর্থনে এই খাতের বিকাশ ঘটলেও বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা প্রাইভেসির ভবিষ্যৎ কী হবে, সেই প্রশ্নটিই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।