মধ্যপ্রাচ্য

মধ্যপ্রাচ্য অর্ডার করতে ক্লিক করুন

সিরিয়ার বিদেশী যোদ্ধাদের নিয়ে যা ভাবছেন আহমাদ আশ শারা

এই যোদ্ধারা বিপ্লবের প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থন এবং মজলুমদের সহায়তার লক্ষ্যে সিরিয়ায় এসেছিল। তাদের বেশিরভাগ এসেছে মধ্য এশিয়া, আরব, তুরস্ক, বলকান ও ইউরোপ থেকে।
ছবি : মধ্যপ্রাচ্য
ছবি : মধ্যপ্রাচ্য

বাশার আল আসাদের পতনের পর সিরিয়ার নতুন সরকারের সামনে যেসব বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তার মধ্যে সিরিয়ার বিদেশী যোদ্ধাদের বিষয়টি অন্যতম। যুদ্ধের সময় বিশ্বের কয়েক ডজন দেশ থেকে হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধা সিরিয়ায় প্রবেশ করেছে এবং বিভিন্ন পক্ষের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে।

এই ইস্যুতে নিরাপত্তা, আইনি দিক ও মানবিক বিষয়াবলি একে অপরের সাথে জড়িয়ে আছে, তাই যুদ্ধ থামার পর এই যোদ্ধাদের কীভাবে সামলানো হবে, সেই প্রশ্ন আবার দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, অপরাধে জড়িতদের বিচার, নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের সুযোগ থাকা যোদ্ধাদের ফেরত পাঠানো অথবা যারা সিরিয়ায় স্থায়ী হয়েছে, তাদের স্থানীয় সমাজের সাথে একীভূত করা। এই ইস্যুটি আন্তর্জাতিকভাবেও গভীর মনোযোগ পাচ্ছে, কারণ এটি তাদের মতে চরমপন্থার পুনরাবির্ভাব এবং সীমান্ত অতিক্রমকারী সন্ত্রাসী কার্যকলাপের আশঙ্কার সাথে সম্পর্কিত। উল্লেখ্য, এই যোদ্ধারা কোনো একক গোষ্ঠীর নয়; তারা ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ ও শক্তির অন্তর্গত।

সিরিয়ায় বিদেশী যোদ্ধারা মূলত চার ভাগে বিভক্ত

১. বাশারের পতনের পরও সিরিয়ায় থেকে যাওয়া যোদ্ধারা

এই যোদ্ধারা বিপ্লবের প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থন এবং মজলুমদের সহায়তার লক্ষ্যে সিরিয়ায় এসেছিল। তাদের বেশিরভাগ এসেছে মধ্য এশিয়া, আরব, তুরস্ক, বলকান ও ইউরোপ থেকে। আসাদবিরোধী লড়াইয়ে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ নতুন সরকার তাদেরকে সুযোগ-সুবিধা এমনকি নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা ভাবছে। তবে পাশাপাশি এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলা হচ্ছে, তারা দেশের বাইরে কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করছে না এবং সিরিয়ার স্থানীয় সমাজে তাদের একীভূত করা সম্ভব।

স্বৈরাচারী আসাদ সরকারের পতনের আগেই হাইয়াত তাহরির আশ-শাম (HTS) এবং তুর্কিস্তানি পার্টি বা ফরাসি-সেনেগালি ওমর ওমসেনের নেতৃত্বে ফরাসি যোদ্ধাদের মতো কিছু বিদেশী গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত দেখা গিয়েছিল। সম্প্রতি বিভিন্ন ইস্যুত এই সংঘাত আবারও দেখা দেয়, যা পরবর্তীতে সিরীয় ও বিদেশী মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সাধারণ নিরাপত্তা সংস্থা ও ফরাসি যোদ্ধাদের মধ্যে একটি চুক্তির মাধ্যমে শেষ হয়।

২. বাশার আল আসাদের পক্ষে লড়াই করা বিদেশী যোদ্ধা

এরা প্রধানত ইরানের মিলিশিয়া (যেমন ফাতেমিয়ুন ব্রিগেড, হাশদ আশ-শাবি)। এরা তারা এসেছে ইরান, আফগানিস্তান, ইরাক ও অন্যান্য দেশ থেকে। বিজয়ের পর তাদের অনেকে দেশে থেকে গেছে অথবা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে মিশে গেছে, যদিও তাদের পরিচয় সবার জানা নেই।

এদের বেশিরভাগের বিরুদ্ধে সিরীয় নাগরিকদের ওপর গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। ফলে যাদের এখনো সিরিয়ায় সক্রিয় উপস্থিতি প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও বিচার শুরু করার দাবি সামনে আসছে।

এর মধ্যে ইরাকি, আরব ন্যাশনালিস্ট এবং কিছু ফিলিস্তিনি-ইরাকি যোদ্ধাও রয়েছে, যারা বাশারের হয়ে পক্ষে লড়াই করেছিল।

৩. দায়েশ (ISIS) সদস্য ও আটক যোদ্ধারা

এরা বর্তমানে এসডিএফ (কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস)-এর কারাগারে আটক রয়েছে এবং তাদেরকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসের আশঙ্কায় সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। একশটিরও বেশি দেশ থেকে আসা এই হাজার হাজার যোদ্ধা ব্যাপক রক্তপাত, সহিংসতা ও চরমপন্থী জোট তৈরি করেছে। এদেরকে স্থানীয়ভাবে বিচার করা হবে নাকি নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে, তা নিয়ে আইনি জটিলতা রয়েছে। কারণ অনেক দেশই তাদের গ্রহণ করতে নারাজ। এদের মধ্যে অনেকে সিরিয়ার স্থানীয় ক্যাম্প বা কারাগারে আটক আছে। এই বাহিনী শুধু সিরিয়ার একক সংকট নয়, আন্তর্জাতিক জটিলতাও বটে। বিশেষত তাদের মধ্যে অনেক শিশু রাষ্ট্রহীন, কোনো দেশের নাগরিকত্বহীন। এদের মা-বাবা কিংবা কোনো একজনেরও হদিস

নেই।

৪. এসডিএফ (কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস)-এর পক্ষে যুদ্ধরত বিদেশী যোদ্ধারা

এসডিএফ-এর পক্ষেও কিছু বিদেশী যোদ্ধা রয়েছে, বিশেষ করে ইউরোপ বা তুরস্ক থেকে আসা সদস্যরা। তবে এসডিএফ-এর নেতৃত্বের বড় অংশ সিরীয় নয়; বরং কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (PKK)-এর নেতৃত্বে রয়েছে। এই যোদ্ধাদের জন্য একটি সমাধানের পথ বের করতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ঐকমত্যের প্রয়োজন।

ভবিষ্যতে এদের প্রত্যাবর্তন ও সমাজে একীভূতকরণ কঠিন হতে পারে। কারণ পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে সিরিয়ার নতুন সরকার ও এসডিএফ-এর মধ্যে চলমান সমঝোতার ওপর, যার অন্যতম মূল ইস্যু হলো এসডিএফ-সংশ্লিষ্ট বিদেশি যোদ্ধাদের ভবিষ্যৎ।

বিদেশি যোদ্ধাদের বিষয়ে উৎস দেশগুলোর উদ্বেগ ও আইন প্রণয়নের অনিবার্যতা

সিরিয়ায় থাকা বিদেশি যোদ্ধাদের নিজ দেশে ফেরত নিতে বেশিরভাগ রাষ্ট্রই অনাগ্রহী। বিশেষ করে যারা আইএস-এর হয়ে লড়েছে, তাদের ক্ষেত্রে। তাদের ফেরত আসা নিয়ে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ রয়েছে। যেমন, চরমপন্থার পুনরুত্থান, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে নতুন সেল গঠন। পাশাপাশি সীমান্তের বাইরে সংঘটিত ঘটনাগুলোর প্রমাণ দুর্বল হওয়ায় তাদের আইনের আওতায় আনাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ডসহ বহু ইউরোপীয় দেশ চায়, এই যোদ্ধাদের সিরিয়া বা ইরাকেই বিচার হোক। পাশাপাশি তারা সিরিয়া সরকারের কাছে দাবি করছে, এরা যেন কোনোভাবেই সেনাবাহিনী বা প্রশাসনের নেতৃত্বস্থানীয় পদে যেতে না পারে এবং তাদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধের ভিত্তিতেই যেন তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

অন্যদিকে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো প্রমাণ সংগ্রহ, তথ্য আদান-প্রদান এবং কঠোর আইন প্রণয়নের দিকে এগোচ্ছে, যাতে দেশে ফেরত আসা যোদ্ধারা কোনোভাবেই আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করতে না পারে। একইসঙ্গে যোদ্ধাদের সাথে থাকা নারী-শিশু ও তাদের পরিবারের প্রত্যাবাসনেও তারা স্পষ্ট নীতিমালা, নিরাপত্তা যাচাই এবং মানবাধিকার সুরক্ষাকে অপরিহার্য বিবেচনা করছে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা

বিদেশি যোদ্ধাদের ইস্যু সমাধানে বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতময় অঞ্চলে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বসনিয়া, আফগানিস্তান ও চেচনিয়ার উদাহরণ।

বসনিয়া যুদ্ধের (১৯৯২-৯৫) সময় হাজারো বিদেশি মুজাহিদিন সার্বীয় ও ক্রোয়েশীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে বশনিক মুসলমানদের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিল। যুদ্ধ শেষে তাদের একটি অংশকে নাগরিকত্ব দেওয়া হয় এবং কিছুসংখ্যক যোদ্ধাকে সমাজে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা হয়। কিন্তু কঠোর আদর্শিক অবস্থান ও নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে না পারার কারণে এ অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে নিরাপত্তা ও আইনি সংকটে রূপ নেয়।

আফগানিস্তান ও চেচনিয়ার ক্ষেত্রেও বিপুলসংখ্যক বিদেশি যোদ্ধার অংশগ্রহণ যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে নতুন নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করে। ফিরে যাওয়া এই যোদ্ধারা ‘গ্লোবালি সশস্ত্র সক্রিয়তা’ বিস্তারের বড় উৎসে পরিণত হয়। ফলে বহু রাষ্ট্র কঠোর আইন, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, বিচার প্রক্রিয়া ও পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু করতে বাধ্য হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব অভিজ্ঞতা সিরিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা, যদি সিরিয়া দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই নিরাপত্তা কৌশল গড়ে তুলতে চায়।

বিদেশি যোদ্ধা ব্যবস্থাপনা: আইনি কাঠামো কেমন হওয়া উচিত?

সিরিয়ান হিউম্যান রাইটস নেটওয়ার্কের পরিচালক ফাদ্‌ল আব্দুল গনি বলেন, এটি অত্যন্ত জটিল একটি চ্যালেঞ্জ এবং এতে বিভিন্ন পক্ষ জড়িত। তিনি বলেন, সরকারি আমন্ত্রণে সিরিয়ায় প্রবেশকারী যোদ্ধাদের সঙ্গে বিদেশি সশস্ত্র সংগঠনের সদস্যদের মিলিয়ে দেখা ঠিক নয়। তিনি আরও বলেন, যারা সিরীয়দের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে, তাদের সমাজে একীভূত করা যেতে পারে, তবে তাদের নেতৃত্বস্থানীয় পদে বসানো উচিত নয় এবং স্থানীয় আইনের অধীনে সাধারণ নাগরিক হিসেবে তাদের সাথে আচরণ করা উচিত।

তিনি আরও পরামর্শ দেন, জাতিসংঘের কর্মসূচি এবং পূর্ববর্তী আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক পুনর্বাসনের মানদণ্ড তৈরি করা যেতে পারে, এবং মানসিক ও সামাজিক চরমপন্থার কারণগুলোকে মোকাবেলা করার জন্য শিক্ষা, নিরাময়মূলক এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

একীভূত হওয়ার জন্য যোদ্ধাদের স্থানীয় আইন, সামাজিক মূল্যবোধ ও দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের ধারণার সাথে মানিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি যোদ্ধাদের একটি সুসংহত পরিবেশে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নাগরিক হিসেবে সমাজে স্থান দেওয়া, পরিবারভিত্তিক সহায়তা, মনস্তাত্ত্বিক পুনর্গঠন, বিপদজনক আচরণে ফিরে আসা রোধ করার জন্য শিক্ষামূলক ও সামাজিক সমর্থন নিশ্চিত করা এবং নিরাপত্তা সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

বিদেশি যোদ্ধাদের এই চ্যালেঞ্জটি সিরিয়ার জন্য একটি চরম জটিল জট হিসেবে রয়ে গেছে, যা অভ্যন্তরীণ স্থিতি, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক– সব ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলছে এবং ফেলবে। অতএব ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা এবং পুনর্বাসনের সমন্বয়ে গঠিত বিচক্ষণ নীতি প্রয়োজন। আইন প্রণয়ন ও একীভূতকরণে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে সিরিয়াকে অবশ্যই শিক্ষা নিতে হবে। এই সমস্যাটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে। ভবিষ্যতের ঝুঁকি থেকে দেশ এবং স্থানীয় জনগণকে রক্ষা করবে এমন একটি স্বচ্ছ, কার্যকর ও ব্যাপক আইনি কাঠামো তৈরি করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও অপরিহার্য।

সরকারি বাহিনীর সাথে বিদেশী যোদ্ধাদের সাথে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ : মিডিয়া প্রোপাগান্ডা বনাম বাস্তবতা 

গত অক্টোবরের শেষ দিকে সিরিয়ার সরকারি বাহিনী ও আল-গুরাবা বিগ্রেডের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ বাধে। উত্তর সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশে ফরাসি যোদ্ধাদের সমন্বয়ে গঠিত ‘আল-গুরাবা’ ব্রিগেড এবং সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর মধ্যে একদিনব্যাপী এ সংঘর্ষ বিদেশি যোদ্ধাদের বিষয়টি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে ফিরিয়ে এনেছে। এটি রাজনৈতিক, নিরাপত্তা এবং নৈতিক বিবেচনায় সবচেয়ে জটিল ও পরস্পর-সংযুক্ত ইস্যুগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে আন্তর্জাতিক মহলের দাবি, বিদেশি যোদ্ধাদের যেন সরকারি উচ্চপদে কোনোভাবেই বসানো না হয়; অন্যদিকে নতুন সিরীয় প্রশাসন ‘ভাই ও যুদ্ধের সহচর’ বলে অভিহিত করা এই যোদ্ধাদের সাথে কীভাবে আচরণ করবে তা নিয়ে অনেক জল্পনাকল্পনা চলছে।

অক্টোবরে ফরাসিদের এই ব্রিগেডের সাথে সংঘর্ষের আগে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমাদ আশ-শারা বহুবার বিদেশি যোদ্ধাদের প্রশংসা করে বলেছেন, সিরিয়ার মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসা অভিবাসী ভাইদের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেসব বিদেশি যোদ্ধা সিরিয়ায় আছেন, তারা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জন্য কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করবে না, নিজ নিজ দেশকেও ক্ষতির মুখে ফেলবে না; বরং তাদের সিরিয়ার সমাজের সঙ্গেও ধীরে ধীরে একীভূত করা সম্ভব।

যদিও প্রেসিডেন্ট আহমদ আশ-শারা প্রসংশাপূর্বক বিদেশি যোদ্ধাদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ও তাদের সাথে ডিল করার একটি পদ্ধতি নির্ধারণ করেছেন, কিন্তু বাস্তবতা পুরোপুরি সহজ নয়। 

সংঘর্ষের দুটি ভিন্ন বর্ণনা

চলতি বছরের ২২ অক্টোবর সিরিয়ার সরকারি বাহিনী ও ফরাসি যোদ্ধাদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। ইদলিবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা অধিদপ্তর জানায়, তারা উত্তর ইদলিবের হারিম শহরে অবস্থিত এক ক্যাম্পে অভিযানে যায়, যেখানে আল-গুরাবা ব্রিগেডের অন্তর্ভুক্ত ফরাসি যোদ্ধারা অবস্থান করছিলেন এবং তাদের নেতা ওমর ওমসেনও (ওমর দিয়াবি) ছিলেন। সেখানেই প্রথম সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।

সরকারি বর্ণনা: সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, স্থানীয় বাসিন্দাদের একাধিক অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের বাহিনী সেখানে যায়। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন, যার সর্বশেষটি ছিল নেতা ওমর দিয়াবির নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র দল কর্তৃক এক মেয়েকে তার মায়ের কাছ থেকে অপহরণের চেষ্টা। সরকারি বাহিনী ক্যাম্পটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে, প্রবেশ-বহির্গমন পথে নজরদারি পোস্ট স্থাপন করে এবং নিরাপত্তা টিম মোতায়েন করে। একই সঙ্গে তাদের নেতাকে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে ক্যাম্পের ভেতরে অবস্থান নেন, বেসামরিক নাগরিকদের বের হতে বাধা দেন, নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে গুলি ছোড়া শুরু করেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন।

আল-গুরাবার বয়ান: অন্যদিকে ওমর দিয়াবি ১১ বছর বয়সী শিশু মাইমুনাহকে অপহরণের অভিযোগ অস্বীকার করে উলটো তিনি সিরিয়ার সরকারি নিরাপত্তা সংস্থার সহযোগিতায় ফরাসি গোয়েন্দাদের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা করার অভিযোগ করেন। আল-গুরাবা ব্রিগেডের সাথে সম্পর্কিত সূত্রগুলো মাইমুনার ফ্রান্স-প্রবাসী পিতা এবং মায়ের মধ্যে একটি আইনি অভিযোগের নথি প্রকাশ করে। নথিতে মায়ের বিরুদ্ধে তার নাবালিকা মেয়েকে চল্লিশ বছর বয়সী এক পুরুষের সাথে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালানোর অভিযোগ করা হয়।

এই ঘটনার পর বিভিন্ন জাতীয়তার অভিবাসীদের ভিডিও বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। এতে কারো কারো অবস্থান ছিল ফরাসি যোদ্ধাদের সমর্থন করার পক্ষে, আবার কেউ কেউ আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানোর আহ্বান জানান। তাদের অনেকে জোর দাবি করেন, বিদেশি যোদ্ধাদের ওপর পদ্ধতিগত দমননীতির অভিযোগ সঠিক নয়; বরং পরিস্থিতি তার উল্টো।

ঘটনা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সিরিয়া প্রেসিডেন্টের গণমাধ্যমবিষয়ক উপদেষ্টা আহমদ জাইদান বলেন, ‘এটি বিদেশি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নয়; বরং এর মূল কারণ হলো আইনের প্রতি অবাধ্যতা।’ তিনি মন্তব্য করেন, এ কাজ কোনো সিরীয় করলেও একই ব্যবস্থা নেওয়া হতো। আজকের সিরিয়া একটি আইন-শাসিত রাষ্ট্র এবং সবাইকে তা মেনে চলতে হবে।

ছয় দফা সমঝোতা চুক্তি

সংঘর্ষের পর দুই পক্ষের কাছ থেকে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি এবং বর্তমানে পরিস্থিতি মধ্যস্থতা ও বিচারিক প্রক্রিয়ার দিকে এগোচ্ছে। ‘নুন পোস্ট’ ওয়েবসাইট সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি এবং ফরাসি অভিবাসী যোদ্ধাদের একটি দল, পাশাপাশি অন্যান্য অভিবাসী (তুর্কিস্তান, উজবেক এবং তাজিক) প্রতিনিধিদের মধ্যে ছয় দফা চুক্তির একটি অনুলিপি পেয়েছে, যার শর্তাবলী নিম্নরূপ:

  • উভয় পক্ষ থেকে উচ্চ সতর্কতার অবস্থান শিথিল করা এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা।
  • উভয় পক্ষ থেকে মিডিয়া উস্কানি বন্ধ করা।
  • পুরো বিষয়টি বিচার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন শরিয়াহ আদালতে প্রেরণ করা।
  • তিনজন অভিবাসী প্রতিনিধি (উজবেক, তুর্কিস্তান, তাজিক) আদালতে ওমর দিয়াবির মামলা অনুসরণ করবেন।
  • সিরীয় সরকারের জন্য ক্যাম্প খুলে দেওয়া।
  • ভারী অস্ত্রশস্ত্র সেনানিবাসে ফিরিয়ে নেওয়া।
  • সংঘর্ষের ঘটনায় যেসব ব্যক্তি মবিলাইজড হয়েছেন, তাদের কারও বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ না নেওয়া।

সিরিয়ায় অবস্থানরত ফরাসি যোদ্ধারা মূলত আল-গুরাবা ব্রিগেডের অধীন, যার নেতৃত্বে রয়েছেন ওমর দিয়াবি (৫০)। দলে প্রায় ৭০ জন ফরাসি যোদ্ধা রয়েছে, যারা তুরস্ক সীমান্তের কাছে অবস্থিত একটি ক্যাম্পে বসবাস করেন। ক্যাম্পটি চারপাশে উচ্চ দেয়াল দিয়ে ঘেরা, যেখানে ব্রিগেডের সদস্যরাই পরিবার-পরিজনসহ ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে নজরদারি ক্যামেরা ও মুভমেন্ট সেন্সর বসিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন।

ওমর দিয়াবি ও সিরিয়ার বর্তমান সরকারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতপার্থক্য, উত্তেজনা ও অস্বস্তিকর সম্পর্ক বিরাজ করছে। হাইয়াত তাহরির আশ-শাম (বর্তমান সরকারের কেন্দ্রীয় অংশ) তাকে দুইবার আটক করেছিল। শেষবার ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত মোট ১৭ মাস আটক ছিলেন তিনি। দিয়াবি অতীতে HTS-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন, তারা বিশ্বাসযোগ্যতা ও সততার অভাবে ভোগে এবং তাদের ওপর ভরসা করা যায় না, কারণ তারা সিরিয়ার জনগণ ও মুজাহিদদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।

ওমর দিয়াবি ২০১৩ সালে সিরিয়ায় আসেন এবং বর্তমানে আল-গুরাবা ব্রিগেডের প্রকৃত নেতা হিসেবে বিবেচিত। ফরাসি কর্তৃপক্ষের ভাষায় তিনি সিরিয়া বা ইরাকে পাড়ি জমানো ফরাসিভাষী যোদ্ধাদের ৮০ শতাংশ নিয়োগের জন্য দায়ী। এছাড়া মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর ২০১৬ সালে তাকে বৈশ্বিক সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে।

সহযোগী বিদেশি যোদ্ধারা রাষ্ট্রের জন্য হুমকি নয়; বরং ভাই

বাশার আল-আসাদের শাসনের পতনের কয়েক ঘণ্টা পরই সিরিয়ায় বিদেশি যোদ্ধাদের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা বেড়ে যায়। এই যোদ্ধারা বহু বছর ধরে পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য একটি জটিল ইস্যু হয়ে আছে। বিশেষ করে ২০১৩ সালে হাজারো বিদেশি যোদ্ধা তুরস্ক হয়ে সিরিয়ায় প্রবেশ করে বিভিন্ন দলে সংগঠিত হয়ে যুদ্ধে অংশ নেয়। ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমানে এদের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। এদের মধ্যে অনেকে যুদ্ধের পাশাপাশি চিকিৎসা ও ত্রাণ সহায়তার কাজেও যুক্ত ছিলেন।

গত মার্চে দামেস্কে সিরীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসআদ শাইবানির সাথে বৈঠকে তিনজন ইউরোপীয় দূত স্পষ্ট করে জানান, বিদেশি জিহাদিদের নির্মূল করাই তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তারা সতর্ক করে বলেন, এই বিষয়ে চূড়ান্ত পদক্ষেপ না নেওয়া হলে সিরীয় সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন হ্রাস পেতে পারে।

একইভাবে মার্কিন, ফরাসি এবং জার্মান প্রতিনিধিরা নতুন সিরীয় প্রশাসনকে সতর্ক করে জানিয়েছেন, উচ্চ সামরিক পদে বিদেশি জিহাদিদের নিয়োগ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের, এবং এটি নবগঠিত সরকারের ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে; বিশেষত যখন সিরিয়া অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোর সাথে নতুন কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

বিদেশি যোদ্ধাদের শীর্ষ সরকারি পদ থেকে দূরে রাখা ছিল নতুন সিরীয় প্রশাসনের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম, যার বিনিময়ে সিরিয়ার উপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সম্ভাব্য উন্মুক্ততার পথ তৈরি করার কথা ছিল। পরে ওয়াশিংটন নতুন সিরীয় নেতৃত্বের প্রস্তাবিত একটি পরিকল্পনায় সম্মতি জানায়, এতে পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছতার সঙ্গে হওয়ার শর্তে সাবেক বিরোধী দলে থাকা প্রায় ৩,৫০০ বিদেশি যোদ্ধাকে সিরীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।

অন্যদিকে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমদ আশ-শারা বারবার বিদেশি যোদ্ধাদের ইতিবাচক ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন। তার ভাষায়, বিদেশি যোদ্ধারা দলবদ্ধভাবে নয়; বরং বিপ্লবের সময় ব্যক্তিগতভাবে সিরীয় জনগণকে সহায়তা করতে এসেছিলেন। সিরিয়ায় থেকে যাওয়া বিদেশি যোদ্ধারা কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জন্য হুমকি নয় এবং তাদের নিজ নিজ দেশেও কোনো ক্ষতি করবে না বলে শারা আশ্বস্ত করেন।

তিনি আরও বলেন, বিদেশি যোদ্ধাদের নাগরিকত্ব দেওয়াও অসম্ভব কিছু নয়। কোন কোন বিদেশি যোদ্ধা ও তাদের পরিবার নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য তা নতুন সংবিধান নির্ধারণ করবে। একই সঙ্গে সিরিয়ার আদর্শ ও মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যোদ্ধাদের সমাজে একীভূত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে সামরিক পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘোষিত ৫০টি সামরিক পদের মধ্যে অন্তত ছয়টি বিদেশিদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে।

২০২১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর এক বক্তব্যে আহমদ আশ-শারা বিদেশি যোদ্ধাদের ’সহায়তায় আগত ভাই’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন এবং ভবিষ্যত সিরিয়ায় তাদের অবস্থান সম্পর্কে একটি প্রশ্নের জবাবে তাদের কখনও ত্যাগ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেন: ‘তারা আমাদের অংশ। তারা জনগণের সঙ্গে মিশে আছে, মানুষ খুশিমনে তাদের গ্রহণ করেছে। তারা আমাদের রাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি নয়। তারা আমাদের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামোর অধীনেই রয়েছে।’

প্রভাব ভেঙে দেওয়া এবং যোদ্ধাদের একীভূতকরণ

আল-গুরাবা ব্রিগেডের সাথে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ দামেস্কের বিদেশি যোদ্ধাদের সাথে ডিল করার প্রক্রিয়াকে নতুন এক পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। এই মুখোমুখি পরিস্থিতি একটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে— দামেস্ক কি আগের মতো নমনীয় কৌশল ও নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখবে, না কি এবার আরও কঠোর নীতি গ্রহণ করবে? বিশেষত যখন ফ্রান্সের নাগরিকদের নিয়ে গঠিত গুরাবা ইউনিট আনুষ্ঠানিকভাবে সিরীয় সেনাবাহিনীর ৮২তম ডিভিশনের অংশ হলেও কার্যত উত্তর ইদলিবে নিজেদের ক্যাম্পের ভেতর স্বায়ত্তশাসন জারি রেখেছে।

জিহাদি গোষ্ঠী ও ধর্মীয় আন্দোলন বিষয়ক গবেষক আব্দুল রহমান আল-হাজ্জ মনে করেন, সাম্প্রতিক সংঘর্ষটি সরকারের ঘোষিত ‘রাষ্ট্রের কাছে অস্ত্র সীমিত করা’-এর নির্দেশনা কাঠামোর মধ্যেই পড়ে। তার মতে, এই প্রক্রিয়াটির মধ্যে বিদেশি যোদ্ধাদের দলগুলোসহ সকল দলকেই অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যাতে একদিকে তারা রাষ্ট্রের নীতি মেনে চলতে বাধ্য হয় এবং অন্যদিকে তাদের ভেঙে দিয়ে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে পুনর্গঠন করা যায়।

গবেষক আল-হাজ্জ বলেন, ফরাসি আল-গুরাবা ব্যাটালিয়নটি প্রায় একটি ইমারাত বা স্বাধীন প্রশাসনিক অঞ্চল তৈরি করে ফেলেছে, যেখানে সরকারি উপস্থিতি তারা স্পষ্টভাবে সীমিত করতে চেয়েছে। যদিও তারা কাগজে-কলমে সেনাবাহিনীর অংশ, কিন্তু বাস্তবে নিজেদের আলাদা ক্ষমতাকেন্দ্র তৈরি করেছে, যা সরকারের সঙ্গে তাদের চুক্তির পরিপন্থী। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের বাইরে অস্ত্র থাকা বা সরকারের সমান্তরাল কোনো গোষ্ঠীর অস্তিত্ব থাকার কোনো যৌক্তিকতা নেই। আল-হাজ্জ আরও বলেন, এই পদক্ষেপটি বিদেশি যোদ্ধাদের দলগুলোকে ভেঙে দেওয়া এবং সেনাবাহিনীর কাঠামোতে একীভূত করার নীতি বাস্তবায়নে সরকারের গুরুত্বের ইঙ্গিত হতে পারে। তিনি আরও যোগ করেন, বৈশ্বিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো তাদের নিজেদের ভেঙে দিতে, রাষ্ট্রের কাছে অস্ত্র সমর্পণ করতে বা রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে যেতে খুব কমই রাজি হয়, বিশেষত যদি তারা সরকারকে ক্ষমতায় আনা বা বিজয় অর্জনে অংশ নিয়ে থাকে।

আহমদ আশ-শারা একাধিকবার জোর দিয়ে বলেছেন, সিরিয়া রাষ্ট্রের বাইরে কোনো অস্ত্রের অনুমতি দেবে না। তিনি জোরালোভাবে বলেন: ‘বিপ্লবের যুক্তি আর রাষ্ট্রের যুক্তি ভিন্ন।’

এদিকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সশস্ত্র বাহিনীর প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং সাংগঠনিক কাঠামোকে সুসংগঠিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে বাহিনীর কাঠামো ঠিক রাখা, পরিচয়পত্র ও অস্ত্র বহনের কার্ড ইস্যু সংক্রান্ত নীতিমালা এবং আরও কিছু প্রশাসনিক সংস্কার। গত ৩০ মে ২০২৫ সামরিক আচরণবিধি ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত একটি নতুন নির্দেশনাও জারি করা হয়েছে।

গবেষক আল-হাজ্জ মনে করেন, আল-গুরাবা ব্রিগেডের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিদেশি যোদ্ধাদের কিছু গোষ্ঠী নিজেদের আরও আলাদা করে ফেলতে পারে এবং সরকারি সেনাবাহিনীতে একীভূত হতে অনাগ্রহ দেখাতে পারে। তবে তার মতে, এসব সত্ত্বেও এ ধরনের বিদেশি গোষ্ঠীগুলো দেশ বা দেশের বাইরে কোথাও সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালাবে, এমন সম্ভাবনা খুবই কম।

তিনি উপসংহারে বলেন, এই ধরনের যেকোনো সংঘাত বিদেশি যোদ্ধাদের সমস্যা সমাধানকে আরও কঠিন করে তুলবে এবং আলোচনা ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে তাদের একীভূত করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আরও বেশি প্রচেষ্টার প্রয়োজন হবে।

এদিকে, জুসুর স্টাডিজ সেন্টারের গবেষক মোহাম্মদ সুলাইমান বলেন, সিরিয়ার প্রেক্ষাপটে এই সংঘর্ষগুলো প্রথম নয়। গত কয়েক মাসে বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারি বাহিনী এবং সিরীয় সেনাবাহিনীতে এখনও যোগ না দেওয়া সামরিক দলগুলোর মধ্যে একই রকম সংঘাত দেখা গেছে, তাদের পটভূমি যাই হোক না কেন। বিদেশি যোদ্ধাদের প্রসঙ্গে গবেষক মোহাম্মদ সুলাইমান মনে করেন, এই ইস্যুটি দেশের ভেতর বড় কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ফেলবে না। বিশেষ করে যেহেতু অনেক যোদ্ধা ইতোমধ্যে সিরীয় সমাজে মিশে যেতে শুরু করেছেন, যা যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন পশ্চিমা দেশে দেখা গেছে।

তবে তিনি স্পষ্ট করেন, কিছু দেশ এখনো তাদের নাগরিকদের বিষয়ে সমাধান দাবি করছে বলেই এ প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কিছু প্রতিক্রিয়া বা চাপ তৈরি করতে পারে। যেমন উইঘুর যোদ্ধাদের বিষয়টি। বেইজিং নিয়মিতভাবে দামেস্কের ওপর চাপ দিচ্ছে উইঘুরদের সিরীয় সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে দিতে এবং এমন একটি রাজনৈতিক সমাধানের দিকে যেতে, যাতে এই গোষ্ঠীগুলোর ভাঙন নিশ্চিত হয়।

তুর্কিস্তান ইসলামিক পার্টি (টিআইপি)-এর উইঘুর যোদ্ধাদের সিরিয়ার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বাহিনীরতে নিয়োগ দেওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে চীন, এটিকে বেইজিং তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ফু কং নিরাপত্তা পরিষদের সামনে বিদেশি সন্ত্রাসী যোদ্ধাদের সিরিয়ায় অব্যাহত কার্যকলাপের বিষয়ে তার সতর্কবার্তা পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং দামেস্ককে সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন।

গবেষক মোহাম্মদ সুলাইমান আশা করেন, পরবর্তী পর্যায়ে সরকার এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেবে। এর মধ্যে রয়েছে একীভূতকরণের প্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং বিদেশি যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষা-সাংস্কৃতিক এবং পুনর্বাসন কোর্সের অধীনে নিয়ে আসা, যাতে তাদের নিয়মিত সিরীয় সেনাবাহিনীর কাঠামোর মধ্যে সম্পূর্ণরূপে একীভূত করা যায় এবং তাদের অনিয়মিত দলের সদস্য থেকে সুশৃঙ্খল সদস্যে রূপান্তরিত করা যায়, যারা একটি স্পষ্ট সামরিক চেইন অব কমান্ডের অধীনে কাজ করবে। তিনি মনে করেন, এই প্রক্রিয়াগুলো নিয়ন্ত্রণ করা অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা অর্জনের একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ, যা কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য আরও উপযুক্ত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিবেশ তৈরি করবে।

সূত্র: এন পোস্ট,আল জাজিরা, বিভিন্ন আরবি সাইট