বিগত কয়েক দিন ধরে সিরিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে একটি নামই বারবার উচ্চারিত হচ্ছে— ‘মুখোশধারী খালেদ’। সম্প্রতি একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এই তরুণ নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখা অবস্থায় ‘আলেপ্পো সবার জন্য’ (حلب ست الكل) শীর্ষক প্রচারণায় নিজের ব্যক্তিগত অস্ত্রটি দান করে দিচ্ছেন। তবে কে এই তরুণ? কেবলই একজন অস্ত্র হস্তান্তরকারী নাকি মুখোশের আড়ালে লুকায়িত আছে তার ভিন্ন কোন পরিচয়? এই যুবক হলেন তিনি, যিনি ২০২৪ সালের শেষভাগে ক্ষমতাচ্যুত বাশার আল-আসাদ সরকারের হাত থেকে আলেপ্পো শহরকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে এক অনবদ্য ও কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন।
বিপ্লবের অতন্দ্র প্রহরী
আল-জাজিরা নেটওয়ার্কের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘সিরিয়া নাও’ (Syria Now) প্রযোজিত প্রামাণ্যচিত্র ‘দামেস্ক অভিমুখে যাত্রা (العبور إلى دمشق)’-তে এই বীরের বীরত্বগাথা উঠে এসেছে। সিরিয়ার নিরাপত্তা বিষয়ক উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল আব্দুল কাদির তাহান বলেন যে, এই মুখোশধারী তরুণ ছিলেন আলেপ্পো শহরের অভ্যন্তরে বিদ্রোহীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা উৎস। টানা চার বছর তিনি নিজের জীবন বাজি রেখে আসাদ সরকারের স্পর্শকাতর তথ্য, সামরিক গতিবিধি এবং অপারেশন রুমের গোপন পরিকল্পনা ইদলিবে বিপ্লবী নেতৃত্বের কাছে পৌঁছে দিতেন।
মেজর জেনারেল তাহানের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২১ সালে খালেদ অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে আসাদ সরকারের নিয়ন্ত্রিত আলেপ্পো শহরে প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি বাহ্যিকভাবে সরকারের সাথে সমঝোতা করে তাদের বাহিনীতে যোগ দেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি ছিলেন আসাদ বাহিনীর ভেতরে ‘বিপ্লবের বিনিদ্র চোখ’।
দুঃসাহসিক অভিযান
গোপনে কাজ করে করে খালেদ আসাদ বাহিনীর সামরিক পরিকল্পনা ও গতিবিধির সূক্ষ্মতম বিবরণ সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। তার দেওয়া নির্ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই হাইআতু তাহরির আল-শাম-এর হাই ট্রেইনড সমুখসারির বাহিনী ‘রেড ব্যান্ডস’ (العصائب الحمراء) আলেপ্পোর কেন্দ্রীয় সামরিক ও নিরাপত্তা কমিটির সদর দপ্তরে হামলা চালায়।
এই বিশেষ অপারেশনে ইরানি সামরিক উপদেষ্টা ‘হাজী হাশেম’, আসাদ বাহিনীর সামরিক গোয়েন্দা শাখার প্রধান, সিগন্যাল ও অপারেশন বিভাগের প্রধান এবং ১২ জন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। এই একটি ঘটনাই আসাদ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে তছনছ করে দিয়েছিল।
জনমানসে রহস্যময় বীর
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই কৌতূহল ভরে প্রশ্ন তুলছেন— কে এই ‘মুখোশধারী খালেদ’? নেটিজেনদের মতে, যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এই বীরের পরিচয় আজও এক রহস্য। অনেকে তাকে ‘আলেপ্পো জয়ের চাবিকাঠি’ হিসেবে অভিহিত করছেন। তিনি এমন এক দুঃসাহসী যোদ্ধা, যিনি অনেক আগেই শত্রুর ডেরায় ঢুকে ভেতর থেকে বিপ্লবের নকশা বুনেছিলেন।
যতটুক জানা যায়, খালেদ মূলত পশ্চিম আলেপ্পোর গ্রামীণ অঞ্চলের বাসিন্দা এবং ‘রেড ব্যান্ডস’ বাহিনীর একজন চৌকস যোদ্ধা। ‘ডিটারেন্স অব অ্যাগ্রেশন (ردع العدوان)’ অভিযান শুরুর ঠিক আগে যে পাঁচজন যোদ্ধা অপারেশন রুম লক্ষ্য করে সেই বিশেষ অভিযান চালিয়েছিলেন, খালেদ ছিলেন তাদের অন্যতম।
বিপ্লবের সেই লড়াকু সৈনিক আজ আবারও আলোচনায় এসেছেন ‘আলেপ্পো সবার জন্য’ অভিযানে শামিল হয়ে। তিনি তার ব্যক্তিগত পিস্তলটি বিক্রি করে জনহিতকর কাজে ব্যয় করার জন্য দান করে দেন। নিলামে সেই পিস্তলটির দাম উঠেছিল ১ মিলিয়ন (১০ লক্ষ) ডলার। তবে এক কোম্পানি খালেদের এ অসামান্য বীরত্ব এবং ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে পিস্তলটি কিনে নিয়ে পুনরায় তাকেই উপহার দেয়।











