বাশার আল আসাদের পতনের পর যে ঝড়ো পরিবর্তন শুরু হয়েছিল, তার এক বছর পূর্ণ হতে চলেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম বর্ষপূর্তিকে সামনে রেখে আহমাদ আশ শারার নেতৃত্বাধীন সিরিয়ার প্রশাসন এখন সেই পথচলার মূল্যায়ন করছে।
এই টালমাটাল এক বছরে সরকার দেশের ভেতরে-বাইরে রাষ্ট্রের নতুন কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পেয়েছে। কিছু জরুরি সেবায় উন্নতি এসেছে, আর বড় শহরগুলোতে নিরাপত্তা পরিস্থিতিও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হয়েছে।
তবু সামনে রয়ে গেছে বড় চ্যালেঞ্জ—অবকাঠামোর দুরবস্থা, অর্থনৈতিক সংকট আর জাতীয় পুনর্মিলনের কঠিন বাস্তবতা এখনো সরকারের প্রধান পরীক্ষাই হয়ে আছে।
এক বছরের শাসনকাল আহমদ আশ শারা ও তাঁর সরকারের সামনে নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দিয়েছে—যদি তাঁরা আগামীতে এসব সুযোগকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেন। একই সঙ্গে এই সময়টিই সিরিয়ার আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অবস্থানে বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তনের ভিত্তি গড়ে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সিরিয়ার প্রথম উদ্যোগ ছিল আঞ্চলিকভাবে নিজেদের অবস্থান নতুনভাবে নির্ধারণ করা। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই সিরিয়া তুরস্ক, সৌদি আরব, কাতার ও জর্ডানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছে। পাশাপাশি আরব আমিরাতের সঙ্গে ইতিবাচক অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার দিকেও আগ্রহ দেখিয়েছে।
এই পালাবদলের স্বাভাবিক প্রতিফলন পড়েছে ইরানের নীতির সঙ্গে সিরিয়ার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং রাশিয়ার সঙ্গে জোটের ওপর। এ নতুন অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবেই ২০২৫ সালের শুরুতে সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমাদ আশ শারা প্রথম বিদেশ সফর করেন সৌদি আরব, তুরস্ক, কাতার ও জর্ডানে।
আসাদ পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে সিরিয়া উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। ১৯৬৭ সাল থেকে দেশটি যে পূর্বশক্তির প্রভাববলয়ে ছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে নতুন দিক খুঁজতে শুরু করে। সেই পথচলার বড় ধাপ ছিল ২০২৫ সালের নভেম্বরের শুরুতে প্রেসিডেন্ট আহমাদ আশ শারার ওয়াশিংটন সফর। এই সফরের পরই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটে সিরিয়ার যোগদানের ঘোষণা আসে।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর দ্রুত এর ইতিবাচক প্রভাবও পড়ে সিরিয়ার ওপর। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সিরিয়ার বৈধতা আরও জোরালো হয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ যে প্রস্তাব পাশ করে, তার মাধ্যমে নতুন সিরিয়ান প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপরে থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়, এ তালিকার প্রথমেই ছিলেন প্রেসিডেন্ট আহমাদ আশ শারা।
মনে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ‘সিজার আইন’ অনুযায়ী সিরিয়ার ওপর আগে যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, পরিস্থিতি তা পুরোপুরি প্রত্যাহারের দিকেই এগোচ্ছে। মার্কিন কংগ্রেসের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান ব্রায়ান মাস্ট গত নভেম্বরের শেষ দিকে জানান, প্রেসিডেন্ট আহমাদ আশ শারার সঙ্গে বৈঠকের কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি সিরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়াকে সমর্থন করছেন।
যুদ্ধের পুরোটা সময় রাশিয়া আসাদ সরকারের পাশে থাকলেও বর্তমান সরকার রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কও অনেকটাই স্বাভাবিক করতে সক্ষম হয়েছে। বৈরিতার জায়গা ছেড়ে এখন সম্পর্কটা সমন্বয় ও অংশীদারিতে রূপ নিয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে দুপক্ষের কর্মকর্তাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সফর শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত অক্টোবর মস্কোতে প্রেসিডেন্ট আশ শারা ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠক এই নতুন সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়।
শারার সাম্প্রতিক সফরের পর এবং উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী ইউনুস ইয়েফকিরভের নেতৃত্বে রুশ প্রতিনিধি দলকে দামেস্কে স্বাগত জানানোর পর সিরিয়ার গণমাধ্যমে একাধিক রিপোর্টে বলা হয়েছে—দুই পক্ষই সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে। পাশাপাশি দক্ষিণ সিরিয়া ইস্যুতেও মস্কো আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আগ্রহ দেখিয়েছে।
গত মাসের শেষ দিকে রুশ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একটি দল সিরীয় সেনাদের সঙ্গে দক্ষিণের কুনেইতরা প্রদেশ ঘুরে এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে, অঞ্চলটিতে রুশ সামরিক পুলিশ মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছে। একই সময়ে সিরিয়ার জন্য রাশিয়া কয়েকটি তেলের চালানও পাঠিয়েছে।
এ ছাড়া সিরিয়া-চীন সম্পর্কেও নতুন অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলছে। সম্প্রতি নিরাপত্তা পরিষদে শারার ও সিরিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আনাস খাত্তাবের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তোলার সিদ্ধান্তে বেইজিংয়ের ভেটো না দেওয়া—সম্পর্কের উষ্ণতার অন্যতম লক্ষণ বলে অভিমত বিশ্লেষকদের।
গত মাসে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসআদ আশ শাইবানি বেইজিং সফর করেছেন। সেখানে দুই দেশের মধ্যে সিরিয়া–চীন ব্যবসায়ী পরিষদ গঠনের বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সিরীয় সরকারের সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের মতো আন্তর্জাতিক শক্তির সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলে দেশের ভেতরে স্থিতিশীলতা ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র যদি আইএস দমনে সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ)–এর প্রতি সমর্থন কমিয়ে দিয়ে তার যোগাযোগ কেবল সিরিয়ার সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেই রাখে, তাহলে পরিস্থিতি আরও বদলাতে পারে।
এ ছাড়া রাশিয়ার সঙ্গে সিরিয়ার আনুষ্ঠানিক ঘনিষ্ঠতা এবং মস্কোর স্বার্থকে মর্যাদা দেওয়ার প্রবণতা, সিরিয়ার উপকূলীয় অঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে স্থিতি ফেরাতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে উন্নতি
সিরিয়ার জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঘরোয়া খাতে প্রতিদিন গড়ে ১৪ ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। এক বছরেরও কম সময়ে উৎপাদন ক্ষমতা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। আগে বেশির ভাগ শহরেই দিনে সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যেত।
কয়েকটি বড় শহরে, বিশেষ করে আলেপ্পোতে টানা প্রায় ২০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী মুহাম্মদ আল বশির বলেন, অবকাঠামো ও সঞ্চালনব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো গেলে প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র আধুনিকায়নে আন্তর্জাতিক কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে একের পর এক সমঝোতা স্মারক সই করেছে বর্তমান সরকার। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত চুক্তিটি হয়েছে নভেম্বরের শুরুতে, বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণে বিশেষায়িত আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর একটি জোটের সঙ্গে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লে তা সিরিয়ার সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা। এতে কলকারখানার কার্যক্রম দীর্ঘ সময় চালু রাখা যাবে। পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্য খাতে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহও বাড়বে।
নিরাপত্তা খাতে অগ্রগতি
সিরিয়ার নিরাপত্তা খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে তা স্পষ্ট। দামেস্ক, আলেপ্পো ও লাতাকিয়ায় এখন তুলনামূলক স্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করছে, অপরাধের হারও কমেছে।
গত কয়েক মাসে সরকার এসব শহরে বেশ কয়েকটি নিরাপত্তা অভিযান চালিয়েছে। টার্গেট ছিল আসাদ সরকারের অনুগত গোষ্ঠীর অবশিষ্ট নেটওয়ার্ক এবং আইএসের সেলগুলো। সবচেয়ে আলোচিত অভিযান ছিল আসাদ শাসনের প্রভাবশালী সদস্য ওসমান আল আসাদকে আটক করা। তিনি আগের সরকারের পক্ষে কাজ করা মিলিশিয়ার নেতৃত্ব ছিলেন এবং জড়িত ছিলেন মাদক ব্যবসার সঙ্গেও।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব অভিযান বেশির ভাগই ছিল আগাম প্রতিরোধমূলক, যাতে এসব সেল কোনো হামলা চালাতে না পারে। এর ফলে বড় শহরগুলোতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও সুদৃঢ় হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় পর্যবেক্ষকেরা।
সিরিয়ার গণমাধ্যম নিরাপত্তা সংস্থার সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, গত মাসে আলেপ্পো শহরে বেশ কিছু অভিযান চালিয়েছে দেশটির নিরাপত্তাবাহিনী। এসব অভিযানে ১৫০ জন চোরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২০২৪ সালের প্রথম ছয় মাসে আসাদ আমলে যেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর নথিতেই দেড় হাজার চুরির ঘটনা ধরা পড়েছিল, তার তুলনায় এটিকে আলেপ্পোর নিরাপত্তা পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারের হস্তক্ষেপে কয়েকটি গোত্রীয় ও সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়াও রোধ করা হয়েছে। সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনা হোমসে। গত ২৩ নভেম্বর সেখানে আলাবি অধ্যুষিত কয়েকটি এলাকায় গোত্রীয় হামলা হয়। জাইদাল এলাকায় বনি খালেদ গোত্রের এক নারী ও এক পুরুষকে হত্যা করে লাশ বিকৃত করার ঘটনাকেই ওই উত্তেজনার কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ডিসেম্বরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টকম জানায়, সিরিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় তারা যৌথ অভিযান চালিয়ে ইসলামিক স্টেটের নিয়ন্ত্রিত ১৫টি অস্ত্রগুদামে আঘাত হেনেছে।
সাম্প্রতিক এই নিরাপত্তা অগ্রগতির পেছনে রয়েছে সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাথমিক পুনর্গঠন। আসাদের পতনের পর প্রথম কয়েক মাসে যে দলাদলি ও ছত্রভঙ্গ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল এবং যা সরকারকে ব্যাপকভাবে বিপাকে ফেলেছিল, তা এখন অনেকটাই কমে এসেছে। ফলে সুসংগঠিত সামরিক ইউনিটের কাঠামো আরও স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিও জোরদার হয়েছে, তবে দক্ষিণের সরকারবহির্ভূত এলাকা ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল এতে ব্যতিক্রম।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অগ্রগতি
গত অক্টোবরের শুরুর দিকে আসাদ সরকারের পতনের পর প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন আয়োজন করে সিরিয়ার সরকার। সার্বিক জনগণনা ও ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা সম্ভব না হওয়ায় নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয় পরোক্ষ ভোটে, নির্বাচনী কলেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে।
এই নির্বাচনে সিরিয়ার বিভিন্ন প্রদেশের মতোই নানা জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়েছে। কুর্দি ও তুর্কমান সম্প্রদায় থেকে যেমন প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন, তেমনি জায়গা পেয়েছেন অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরাও। অবশিষ্ট এক-তৃতীয়াংশ সদস্য মনোনয়ন দেবেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট, যাতে সব গোষ্ঠীর ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব বজায় থাকে।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি কাজে লাগিয়েও সরকার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করেছে। গত মার্চে তারা সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ)–এর সঙ্গে একটি চুক্তি করে, যেখানে এসডিএফ সিরিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও বর্তমান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। যদিও এসডিএফকে সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করার সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া এখনো নির্ধারিত হয়নি, তবু এই চুক্তি দেখিয়েছে—দেশের সব পক্ষকে সাথে নিয়ে এগোতে সরকার গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে।
অর্থনৈতিক সাফল্য
সিরিয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদুল কাদের হাসরিয়া জানান, নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে তারা প্রথম বার্তা পাঠিয়েছে। এটি সিরিয়ার সুইফট আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থায় পুনরায় যুক্ত হওয়ার নিশ্চিত ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ১০ নভেম্বর আইএমএফ–এর একটি প্রতিনিধি দল দামেস্ক সফর করার পর সংস্থাটির সঙ্গে সিরিয়ার যোগাযোগও পুনরায় শুরু হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি দেশের অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা গড়তে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে সিরীয় প্রবাসীদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে যে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ সিরিয়ার ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি উঠতে পারে। নিষেধাজ্ঞা উঠলে দেশটিতে বিনিয়োগ এগোতে যে শঙ্কা ও দ্বিধা রয়েছে, তা দূর হবে—বিশেষ করে যদি সিরিয়ার সরকার বিনিয়োগ-সংক্রান্ত আইনকানুন আরও আধুনিক করে এবং স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে।
রিয়াদে গত অক্টোবরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ সম্মেলনে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমাদ আশ শারা জানান, আসাদের পতনের পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে ২৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এসেছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ১ দশমিক ৫ শতাংশ সংকোচনের পর ২০২৫ সালে সিরিয়ার অর্থনীতি ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে।
চলতি ডিসেম্বরের শুরুতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট প্রতিষ্ঠান ভিসা ঘোষণা করেছে, তারা সিরিয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে একটি রোডম্যাপে একমত হয়েছে। লক্ষ্য, সিরিয়ায় একটি সমন্বিত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা তৈরি করা এবং দেশটিকে বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও পেমেন্ট ব্যবস্থাপনায় সুবিধা বাড়বে, আর সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
২০২৫ সালের শুরু থেকে সিরিয়ায় ফিরেছেন ১২ লাখের বেশি নাগরিক। শরণার্থী-আতিথ্যদানকারী দেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ফিরতে থাকা এসব মানুষের মধ্যে অনেক ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীও আছেন। সরকারি তথ্য বলছে, শুধু আলেপ্পোতেই প্রায় ৯৬০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আবার উৎপাদনে ফিরেছে। যদিও দেশজুড়ে মোট কত প্রকল্প বা কারখানা চালু হয়েছে—তা নিয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি।
তবু এসব অগ্রগতি সত্ত্বেও সিরিয়ার সামনে পথ এখনও দীর্ঘ। আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে হবে, যাতে সিরিয়ার মাটিকে আবার কোনো বৈশ্বিক শক্তির প্রভাব বিস্তার বা টানাপোড়েনের ক্ষেত্র বানানো না হয়। নিরাপত্তা পরিস্থিতিও এখনো নরম–সরম, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়। পাশাপাশি অবকাঠামো ও সামগ্রিক অর্থনীতি পুনর্গঠনে এখনো বিস্তর কাজ বাকি।
সূত্র: আল জাজিরা











