আগামী বছরের পহেলা জানুয়ারি নিউইয়র্ক সিটির নবনির্বাচিত মেয়র হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন জোহরান মামদানি। মামদানির শপথের পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু শহরটিতে সফর করলে তাকে এক ঘণ্টা বা তারও বেশি সময়ের জন্য সাময়িকভাবে আটক রাখার মতো খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে এরপরই কোনো একজন ফেডারেল বিচারকের হস্তক্ষেপে অবিলম্বে তার মুক্তির নির্দেশ দেওয়া হবে। কারণ আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর করার এখতিয়ার নিউইয়র্ক সিটি মেয়রের নয়; বরং এই দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের, নগর বা অঙ্গরাজ্য সরকারের নয়।
আল জাজিরা কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ মন্তব্য করেছেন এক মার্কিন আইনজীবী ও আইন বিশেষজ্ঞ। তিনি তার কর্মস্থলের সংবেদনশীলতার কথা বিবেচনায় নিয়ে পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান।
তবে একই সাথে এই আইনজীবী মনে করেন, মামদানি যে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এতে করে ইসরায়েলি পক্ষকে অনিবার্যভাবে কোনো মার্কিন আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে। এ প্রতিশ্রুতি তরুণ এই নতুন মেয়রের জন্য এক ধরনের বিজয়। তার ভাষ্যে, মামদানির লক্ষ লক্ষ সমর্থক এটিকে তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদাহরণ হিসেবে দেখবেন।
উল্লেখ্য, জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম মেয়র এবং তিনি দক্ষিণ এশীয়-আফ্রিকান বংশোদ্ভূত। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) কর্তৃক জারিকৃত গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় যেসব কর্মকর্তার নাম রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নিউইয়র্ক পুলিশকে নির্দেশনা দেবেন। এই তালিকায় রয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
ক্ষমতা আছে কিন্তু…..!
নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে এলে বিমানবন্দরেই তাকে আটক করা হবে, মামদানির এমন বক্তব্যের পর বহু আইন বিশেষজ্ঞই প্রশ্ন তুলেছেন বাস্তবিক অর্থে তিনি আদৌ এমন কোনো পদক্ষেপ কার্যকর করতে পারবেন কি না।
এ প্রসঙ্গে মার্কিন আইনজীবী হুসামুদ্দিন ওমর বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে (আইসিসি) স্বীকৃতি দেয় না এবং দেশটি এই আদালতের সদস্যও নয়। ইসরায়েলেরও একই অবস্থানে। বরং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং এর কয়েকজন বিচারকের বিরুদ্ধে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মামদানি যদি নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন, সে ক্ষেত্রে কী হতে পারে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ওমর আল জাজিরা কে বলেন, এমন সিদ্ধান্ত নিউইয়র্কের কোনো এক আদালতে ফেডারেল সরকারের সঙ্গে সরাসরি সাংবিধানিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে, শেষ পর্যন্ত ঐ আদালতের কোনো একজন বিচারকই নেতানিয়াহুর মুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
একই সঙ্গে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, মামদানি আদৌ এমন পথে যাবেন কি না তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তার মতে, ওভাল অফিসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে মামদানির যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সাক্ষাৎ হয়েছে, তাতে মনে হয় না তিনি এমন একটি ইস্যুতে সরাসরি প্রেসিডেন্টের মুখোমুখি সংঘাতে যাবেন, যা নিউইয়র্কবাসীর বড় একটা অংশের কাছে মৌলিক ইস্যু নয়। বিশেষ করে যখন তিনি নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের অঙ্গীকার করেছেন তখন এই সন্দেহ আরও প্রখর হচ্ছে।
তবে আইনজীবী হুসামুদ্দিন ওমর এটাও বলেন, নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হলেও আদতে তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। তার মতে, ইসরায়েলের বাইরে বসবাসকারী ইহুদি জনগোষ্ঠীর দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় নগরী নিউইয়র্কে গ্রেফতারের মাধ্যমে নেতানিয়াহুকে সাময়িকভাবে হলেও বিব্রত করাটাও একটি শক্তিশালী প্রতীকী বার্তা হয়ে থাকবে এবং এটি ইসরায়েলি নীতি ও রাজনীতির বিরুদ্ধে পরিবর্তিত জনমতের প্রতি ইঙ্গিত করবে।
ট্রাম্প ও আইন: কূটনৈতিক সুরক্ষা, ভেটো ও নিউইয়র্ক জটিলতা
বিভিন্ন আইনী বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানরা পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক দায়মুক্তি ভোগ করেন, এমনকি গুরুতর অপরাধের অভিযোগের মুখেও এই সুরক্ষা কার্যকর থাকে।
এই নিয়মের একমাত্র ব্যতিক্রম হতে পারে তখনই, যখন সংশ্লিষ্ট মামলা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উপস্থাপন করা হয়। তবে বাস্তবে এটি কার্যত অসম্ভব একটি পথ; অতীতে এমন দৃষ্টান্ত নেই, আর ভবিষ্যতে ঘটলেও এর কার্যকারিতা থাকবে না। কারণ ইসরায়েল কিংবা তার শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত এলে যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই ভেটো প্রয়োগ করে তা আটকে দেয়।
হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকের সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তার সঙ্গে নিউইয়র্কের নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানির অভিন্ন অবস্থান রয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, নিউইয়র্ক সফরে এলে বেনয়ামিন নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের ঘোষণার বিষয়ে দুজনের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি।
এদিকে বেনয়ামিন নেতানিয়াহু গত বুধবার নিশ্চিত করেন, নতুন মেয়রের দেওয়া হুমকি সত্ত্বেও তিনি এখনও নিউইয়র্ক সফরের পরিকল্পনা রাখছেন। মামদানি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের জারিকৃত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকরের কথা বলে নেতানিয়াহুকে আটক করার কথা বলেছিলেন।
এই প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বৃহস্পতিবার বলেন, ডেমোক্র্যাট পার্টির প্রার্থী জোহরান মামদানি যদি নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন, তাহলে তিনি নিজে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবেন। সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কূটনৈতিক বিষয়াদি ও পররাষ্ট্রনীতি সম্পূর্ণভাবে ফেডারেল সরকারের এখতিয়ারভুক্ত। সে কারণে ট্রাম্প প্রশাসন যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে কূটনৈতিক দায়মুক্তির দাবি তুলবে, তা প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করা হচ্ছে। এছাড়া নিউইয়র্ক শহরেই অবস্থিত জাতিসংঘের প্রধান সদর দপ্তর। সংস্থাটির সদর দপ্তর-সংক্রান্ত বিশেষ চুক্তির আওতায় সফররত কূটনীতিকদের গ্রেপ্তার ও মার্কিন আইনের অধীনে বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে একাধিক বিশেষাধিকার ও দায়মুক্তি দেওয়া হয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব আন্তর্জাতিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতার কারণেই নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির জন্য নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের হুমকি বাস্তবায়ন করা প্রতিনিয়ত আরও জটিল হয়ে উঠছে।
মামদানির যুক্তি ও অবস্থান
হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের পর মামদানি আবারও নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের ইচ্ছার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মামদানি বলেন, নিউইয়র্ক একটি আন্তর্জাতিক আইনের শহর এবং এটি আন্তর্জাতিক আদালত কর্তৃক জারিকৃত গ্রেপ্তারি পরোয়ানাকে সমর্থন করবে। এসব পরোয়ানায় নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা চালানো এবং যুদ্ধকৌশল হিসেবে ক্ষুধাকে ব্যবহার করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামদানি আরও বলেন, আমি বহুবার বলেছি এটি আন্তর্জাতিক আইনের শহর। এখানে থাকার অর্থই হলো সেই আইন সমুন্নত রাখার চেষ্টা করা, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের জারিকৃত গ্রেপ্তারি পরোয়ানাগুলোর প্রতি সমর্থন করা, তা নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধেই হোক কিংবা ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধেই হোক।
অন্যদিকে আইন বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মামদানির এই প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবসম্মত কোনো আইনগত কর্মপরিকল্পনা নয় বলে রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন। তাদের মতে, এটি কার্যকরযোগ্য আইনি উদ্যোগ নয়; বরং একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি।
আইন বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, মার্কিন আইন ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতিনীতি অনুযায়ী দায়িত্বে থাকাকালীন নেতানিয়াহু ফৌজদারি গ্রেপ্তার ও বিচারিক প্রক্রিয়া থেকে দায়মুক্তি সুরক্ষা ভোগ করেন। এ ছাড়া মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের তাদের দায়িত্বকালে ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতেই ব্রুকলিনের একটি অংশের প্রতিনিধি, নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের ইহুদি সদস্য ইনা ভারনিকভ আগামী বছরের ১ জানুয়ারি মামদানির শপথগ্রহণের দিন নিউইয়র্ক সফরের জন্য নেতানিয়াহুকে আমন্ত্রণ জানান।
গত ১০ নভেম্বরের একাধিক ইহুদি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক চিঠিতে ভারনিকভ লেখেন, নেতানিয়াহুকে আমন্ত্রণ জানানো আমাদের জন্য বড় সম্মানের। ইনা আরও বলেন, এর মাধ্যমে ইসরায়েল রাষ্ট্র ও নিউইয়র্কবাসীর মধ্যকার গভীর ও স্থায়ী সম্পর্ক আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে। উল্লেখ্য, ইসরায়েলের বাইরে বসবাসকারী ইহুদি জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিউইয়র্কেই সবচেয়ে বেশি মানুষের বসবাস।
ইসরায়েলপন্থী সবচেয়ে প্রভাবশালী লবি সংগঠন ‘আইপ্যাক’ (AIPAC) যুক্তরাষ্ট্রে এমন এক আইনি উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) পদক্ষেপ বাস্তবায়নের সুযোগ সীমিত করে দেবে।
ফ্লোরিডার রিপাবলিকান সিনেটর রিক স্কট এবং নিউইয়র্কের রিপাবলিকান কংগ্রেসওম্যান এলিস স্টেফানিক যৌথভাবে যে প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছেন, তাতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে কেবল আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত থেকে জারি করা অভিযোগপত্র, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা অনুরোধের ভিত্তিতে কোনো বিদেশি নাগরিককে স্থানীয় কিংবা অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে আটক করা যাবে না।
এই আইনি প্রস্তাবটিকে ঘিরে সমর্থন জানিয়ে আইপ্যাক বলছে, এ ধরনের বিধান যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে আন্তর্জাতিক আদালতের এখতিয়ার কার্যকর হওয়া ঠেকাতে সহায়ক হবে।
সূত্র: আল জাজিরা











