বাশার আল আসাদের পতনের পর কৌশলগতভাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান দেশগুলোর একটি হলো তুরস্ক। যেখানে বাশার আল আসাদ তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে বরাবরই অনাগ্রহী ছিল, সেখানে নতুন সিরীয় নেতৃত্ব আঙ্কারার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। নিরাপত্তা ইস্যুতে উভয় পক্ষের অবস্থানও অভিন্ন। বিশেষ করে, তুরস্কের বিরুদ্ধে সিরিয়ার ভূখণ্ড ব্যবহার করে কোনো সন্ত্রাসী তৎপরতা চালাতে না দেওয়া এবং পারস্পরিক ‘রেড জোন’ নির্ধারণের বিষয়ে।
এই পরিবর্তনের ফলে তুরস্ক একদিকে যেমন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ পাচ্ছে, তেমনি সিরিয়ায় তার সামরিক ও নিরাপত্তা উপস্থিতির বৈধতার কারণে সেটা আরও সম্প্রসারণের পথও খুলছে। একই সঙ্গে ইরান ও রাশিয়ার মতো আঞ্চলিক শক্তির তুলনায় তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন হিসেবে বিবেচিত কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ)-এর সামনে বিকল্প পথও সংকুচিত হয়ে আসছে। তবে এই সব অর্জনের পাশাপাশি তুরস্ককে মোকাবিলা করতে হচ্ছে গুরুতর ও জটিল কিছু চ্যালেঞ্জের।
২০২৪ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে ‘রদউল উদওয়ান’ অভিযান শুরু হলে, হাতে গোনা কয়েকটি দেশের মধ্যে তুরস্কই সিরিয়ার বিদ্রোহীদের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখে এবং আসাদ সরকারের বৈধতা প্রত্যাখ্যান করে। এর আগেও আঙ্কারা বারবার পলাতক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক ও উন্নত করার প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু তা প্রত্যাখ্যাত হয়। অভিযানের সূচনালগ্নে মাঠের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে গেলে তুরস্ক বিদ্রোহীদের রাজনৈতিক সমর্থন ও কূটনৈতিক ছায়া দেয় এবং রাশিয়া ও ইরানকে নতুন বাস্তবতা মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে পুরোনো অবস্থায় ফিরে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করে।
বাশার আল-আসাদের দেশত্যাগের মাধ্যমে সিরিয়ায় নতুন অধ্যায় শুরু হলে, তুরস্কই প্রথম দেশ হিসেবে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল দামেস্কে পাঠায়। আসাদ পতনের মাত্র চার দিনের মাথায় তুর্কি গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন দামেস্ক সফর করেন। এ সময় আঙ্কারা আন্তর্জাতিক মহলকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সমর্থন করার এবং দেশটিতে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানায়। পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সিরিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের গুরুত্ব বোঝাতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
গত এক বছরে তুরস্ক অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট আহমাদ আশ শারার অন্যতম ঘনিষ্ঠ ও কার্যকর মিত্রে পরিণত হয়েছে। অর্থনীতি, রাজনীতি, নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতাসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ খাতে আঙ্কারা সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বকে দৃঢ় সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।
নতুন সিরিয়া
আসাদ শাসনের পতনের পর সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী দেশগুলোর মধ্যে তুরস্ক ছিল অগ্রভাগে। যে সরকার তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে অনিচ্ছুক ছিল, তার জায়গায় আসে এমন এক নতুন নেতৃত্ব, যারা আঙ্কারার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী। এই নতুন সরকার তুরস্কের সঙ্গে সিরিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা এবং সিরিয়ার ভূখণ্ড ব্যবহার করে তুরস্কের বিরুদ্ধে কোনো সন্ত্রাসী তৎপরতা হতে না দেওয়ার বিষয়ে একমত হয়। সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের ফলে তুরস্ক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক লাভের পাশাপাশি সিরিয়ায় নিজের সামরিক ও নিরাপত্তা উপস্থিতিকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ পায়, যা পরবর্তীতে আরও বিস্তৃত হয়। একই সঙ্গে ইরান ও রাশিয়ার মতো অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির তুলনায় তুরস্কের প্রভাব বাড়তে থাকে, আঞ্চলিক অবস্থান শক্তিশালী হয় এবং পাশাপাশি তুরস্ক যাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে, সেই সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস এসডিএফ-এর সামনে বিকল্প পথ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসে।
সিরিয়ায় শাসন পরিবর্তন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এরদোয়ানের জন্য উল্লেখযোগ্য সুবিধা এনে দেয়। প্রথমত, এটি তার নেতৃত্বে অর্জিত একটি বড় কূটনৈতিক ও কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখা হয়। দ্বিতীয়ত, তার শাসনামলে তুরস্কের আঞ্চলিক প্রভাব আরও দৃশ্যমান ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তৃতীয়ত, দীর্ঘদিন ধরে যে সিরিয়া ইস্যু বিশেষ করে শরণার্থী সংকট ঘিরে তুরস্কের রাজনীতিতে চাপ তৈরি করে আসছিলো, তা অনেকটাই প্রশমিত হয়। শরণার্থী ইস্যু কে বিরোধীরা নির্বাচনী প্রচারণায় অস্ত্র হিসেবে নিয়মিত ব্যবহার করত, আসাদ সরকারের পতনের পর কার্যত এর গুরুত্ব হারিয়ে যায়। ফলে সিরিয়ান শরণার্থীদের স্থায়ী উপস্থিতি নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক যে উদ্বেগ তুরস্কের ছিল, তাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানই ছিলেন দামেস্ক সফরকারী প্রথম উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা। একই মাসে সফর করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। অল্প সময়ের মধ্যেই আঙ্কারা দামেস্কে একজন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেয়, যিনি আরবি ভাষায় দক্ষ এবং সিরিয়া বিষয়ে বেশ অভিজ্ঞ।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমাদ আশ শারা প্রথম অনারব রাষ্ট্র হিসেবে সফর করেন তুরস্ক। এরপর গত এক বছরে দুই দেশের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে উচ্চপর্যায়ের সফর ও যোগাযোগ হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে আনাতোলিয়া ডিপ্লোমেসি ফোরামে আহমাদ আশ শারার অংশগ্রহণ, পরের মাসে তার আঙ্কারা সফর, নিউইয়র্কে জাতিসংঘের অধিবেশনের ফাঁকে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউস সফরের সময় সিরিয়া, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ত্রিপক্ষীয় বৈঠক। এ ছাড়াও দুই দেশের মধ্যে একাধিক নিরাপত্তা ও সামরিক পর্যায়ের বৈঠক ও সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সহযোগিতার পথসমূহ
তুরস্ক বরাবরই সিরিয়ার স্থিতিশীলতা, সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে নিজেদের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে মনে করে। এই দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতেই আঙ্কারা নতুন সিরীয় প্রশাসনকে নানামুখী সহায়তা দিয়ে আসছে। প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান তুরস্কের সব মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে তাদের সিরীয় সমকক্ষদের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে নতুন সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া, তাঁকে সময় ও সুযোগ দেওয়া এবং বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরার কাজেও তুরস্ক সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়ায় তুরস্কের অগ্রাধিকারগুলো সামনে চলে আসে। এর মধ্যে রয়েছে দেশটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখা, ফেডারেল কাঠামো বা স্বশাসিত প্রশাসনের—বিশেষত উত্তরাঞ্চলে—যেকোনো উদ্যোগ ঠেকানো, তুরস্কে আশ্রয় নেওয়া সিরীয় শরণার্থীদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম করা এবং এমন সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, যা আঞ্চলিক পর্যায়ে তুরস্কের শক্তি ও প্রভাব বৃদ্ধি করবে। দামেস্কের নতুন সরকারও সিরিয়ার ভবিষ্যৎ সংক্রান্ত এসব ‘রেড জোনের’ বিষয়ে আঙ্কারার সঙ্গে একমত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সিরিয়ার ভৌগোলিক ঐক্য রক্ষা, সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ)কে রাষ্ট্রীয় সামরিক কাঠামোর ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করা এবং সিরীয় ভূখণ্ড থেকে তুরস্কের বিরুদ্ধে যেকোনো হামলা প্রতিরোধ করা, যা আঙ্কারার সন্ত্রাসবাদবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সিরিয়ার নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগের দিক থেকে তুরস্ক অন্য সব দেশের তুলনায় এগিয়ে আছে। রাষ্ট্রপতি, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ পর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে প্রকাশ্যভাবে ঘোষিত বৈঠক হয়েছে দশবারেরও বেশি। এর মধ্যে প্রেসিডেন্ট আহমাদ আশ শারার তুরস্ক সফর ছিল তিনবার, যার থেকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা স্পষ্ট হয়।
সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত এগিয়েছে। এ লক্ষ্যে উভয় পক্ষ একটি সামরিক সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। যার মাধ্যমে সমন্বয়, পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও পারস্পরিক সহযোগিতার কাঠামো নির্ধারিত হয়। এই চুক্তির আওতায় সিরিয়াকে সামরিক সরঞ্জাম, অস্ত্রব্যবস্থা ও লজিস্টিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর ভিত্তিতে তুরস্কের ভূখণ্ডে দুই দেশের সেনাবাহিনীর যৌথ প্রশিক্ষণ ও মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি আঙ্কারা সিরিয়ার ভেতরে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছে। নতুন সিরীয় সরকারও তুরস্কের সামরিক উপস্থিতিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে এবং প্রয়োজনে এসডিএফ-এর বিরুদ্ধে যেকোনো অভিযানে সরাসরি সামরিক সহযোগিতার সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক খাতে দুই দেশের সম্পর্ক ফের স্থাপিত হয়েছে। উভয় পক্ষ সরাসরি স্থল পরিবহন চালু করেছে এবং দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার ও বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়াতে একটি যৌথ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কমিটি গঠন করেছে। এ ছাড়া ১০টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। সিরিয়া-তুরস্ক ব্যবসায়িক পরিষদ গঠনের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের মধ্যে সংযোগ বাড়ানো হয়েছে এবং এর প্রথম ব্যবসায়িক ফোরামও আয়োজন করা হয়েছে ইতিমধ্যে। পাশাপাশি পূর্ব ভূমধ্যসাগরে গ্রিসের সঙ্গে চলমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অবস্থান শক্তিশালী করতে দামেস্কের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের উদ্যোগেও তুরস্ক অগ্রসর হচ্ছে।
প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ
সিরিয়া ও তুরস্কের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রশ্নে সিরিয়াকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে তুরস্কের কৌশল এখন পর্যন্ত সফল বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। তবে এই অগ্রগতির পরও উভয় দেশের সামনে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রধান তিনটি হলো—
প্রথমত: অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা
নতুন সিরীয় নেতৃত্ব দেশের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াতেও অগ্রগতি অর্জন করেছে। আসাদ-পরবর্তী সময়ে ক্ষমতা নিয়ে বড় কোনো সংঘাত দেখা যায়নি। তবু এখনো সিরিয়া পুরো ভূখণ্ডে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে পারেনি।
দেশটির উপকূলীয় অঞ্চলে একাধিক নিরাপত্তাজনিত ঘটনা ও সীমিত সামরিক সংঘর্ষ ঘটেছে। একইভাবে সুয়াইদায় পরিস্থিতি সামাল দিতে দামেস্ককে আন্তর্জাতিক ‘শর্তযুক্ত’ একটি সমঝোতার পথে যেতে হয়েছে। এর বাইরে দামেস্কে রকেট হামলার মতো ঘটনাও নিরাপত্তা ঝুঁকির বাস্তবতা সামনে নিয়ে আসছে।
আসাদ ও তার ঘনিষ্ঠ সামরিক নেতৃত্বের বড় একটি অংশ দেশত্যাগ করেছে। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সংকট, নিরাপত্তাহীনতা এবং জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বাস্তবতা মিলিয়ে সিরিয়ায় অস্থিরতা এখনও একটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট হিসেবেই রয়ে গেছে বলা যায়। বিশেষ করে বাইরের হুমকি—যার শীর্ষে রয়েছে ইসরায়েল—এই ঝুঁকিকে আরও জোরালো করছে।
দ্বিতীয়ত: এসডিএফের ভবিষ্যৎ প্রশ্ন
সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস বা ‘এসডিএফে’ নতুন সিরীয় নেতৃত্বের জন্য একটি স্বতন্ত্র ও মারাত্মক চ্যালেঞ্জ। এসডিএফ বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ও অস্ত্রজোগানের মাধ্যমে জাজিরা অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। যেখানে আছে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৌশলগত সুবিধা। এর ফলে তারা কার্যত একটি সংগঠিত ও আধুনিক বাহিনীতে পরিণত হয়েছে।
চলতি বছরের ১০ মার্চ সিরীয় সরকার ও কুর্দি বাহিনীর মধ্যে একটি চুক্তি হয়, যেখানে নির্ধারিত হয়েছে এ বছরের শেষ নাগাদ কুর্দি বাহিনী সিরীয় সেনাবাহিনীতে একীভূত হবে। তবে এখনো চুক্তির মূল দিকগুলো বাস্তবে রূপ পায়নি। কুর্দি বাহিনী প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের দাবি তুলছে, অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট আহমাদ আশ শারার বক্তব্যে সংঘাতের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যা ইতোমধ্যে সীমিত আকারের সংঘর্ষে প্রকাশও পেয়েছে।
তুরস্ক বারবার জানিয়েছে, তারা এই ইস্যুতে একটি অভ্যন্তরীণ সমাধান দেখতে চায়। একই সঙ্গে আঙ্কারা স্পষ্ট করে বলেছে, সিরিয়ার ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ঐক্যের পরিপন্থী কোনো সমাধান তারা মেনে নেবে না, কারণ এর প্রভাব তুরস্কের নিজস্ব কুর্দি সমস্যার ওপরও পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সামরিক সমাধান একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে রয়ে গেছে। সিরীয় সেনাবাহিনী কোনো অভিযানে গেলে তাতে সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমে তুরস্ক সহযোগিতা করতে পারে। পাশাপাশি তুরস্কের হাতে শেষ বিকল্প হিসেবে একক সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। চুক্তিতে নির্ধারিত সময়সীমা প্রায় শেষের পথে। ফলে সময় বৃদ্ধি, সংলাপ নাকি কঠোর সমাধানের পথ—এসব বিষয়ে শিগগিরই তুরস্কসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অবস্থান স্পষ্ট হবে।
এই প্রেক্ষাপটে আঙ্কারা ও দামেস্ক উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রকে কুর্দি বাহিনীর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারে রাজি করানোর চেষ্টা করছে, যাতে এসডিএফকে সিরীয় সেনাবাহিনীতে একীভূত হতে বাধ্য করা যায়। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ধারণার প্রতি সহানুভূতিশীল এবং সিরিয়ার ভৌগোলিক ঐক্যের পক্ষেও তার অবস্থান। এই লক্ষ্যেই আহমাদ আশ শারার ওয়াশিংটন সফরের ফাঁকে সিরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যদিও এর নির্দিষ্ট ফলাফল এখনো স্পষ্ট নয়।
তৃতীয়ত: ইসরায়েলি আগ্রাসন ও সম্প্রসারণবাদী তৎপরতা
আসাদ সরকারের পতনের পর থেকেই ইসরায়েল সিরিয়ার জন্য একটি প্রধান হুমকিতে পরিণত হয়েছে। তারা একতরফাভাবে ১৯৭৪ সালের বিচ্ছিন্নতা চুক্তি বাতিল করেছে, দক্ষিণ সিরিয়ায় দখলদারত্ব সম্প্রসারণ করেছে এবং সিরিয়ার সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে তারা সিরীয় ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ, বেসামরিক নাগরিক হত্যা ও গ্রেপ্তার করেছে। এমনকি প্রেসিডেন্ট আহমাদ আশ শারাকে হুমকি এবং প্রেসিডেন্সিয়াল প্রাসাদের আশপাশে হামলা চালানোর মতো দুঃসাহসও দেখিয়েছে।
এ ছাড়া ইসরায়েল প্রকাশ্যেই সিরিয়ার ভেতরের কিছু জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে সমর্থনের কথা বলছে। যেমন সুয়াইদার কিছু দ্রুজ নেতৃত্ব কিংবা উত্তরের কুর্দি বাহিনী। এর ফলে অভ্যন্তরীণ সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে এবং দেশের ঐক্য মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ছে, বিশেষ করে সরাসরি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর।
তুরস্ক স্পষ্টভাবে জানে, যে সিরিয়ায় তাদের স্বার্থের সঙ্গে ইসরায়েলের স্বার্থের মৌলিক বিরোধ রয়েছে। আঙ্কারা ইসরায়েলের আঞ্চলিক আগ্রাসনকে নিজেদের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখে এবং ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ থেকে এই শিক্ষাই নিয়েছে যে, ভবিষ্যতে তারাও একই ধরনের আক্রমণের শিকার হতে পারে। তবু তুরস্ক সিরিয়ায় ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে চায় না। বরং তারা একদিকে নিজেদের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে দামেস্কের সক্ষমতা জোরদার করতে চায়। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে নেতানিয়াহু সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং দামেস্ক-তেলআবিব সংলাপ উৎসাহিত করার পথেই তারা বেশি ভরসা রাখছে।
উপসংহার
এ পর্যন্ত নতুন সিরিয়াকে ঘিরে তুরস্কের কৌশল সফল বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। বর্তমানে দেশটি সিরিয়ার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের একটি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার হলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নিয়েও আশাবাদ বাড়ছে।
দীর্ঘমেয়াদে আঙ্কারা আরও কৌশলগত সুবিধা আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে দুই দেশের মধ্যে সামুদ্রিক সীমান্ত নির্ধারণ। পাশাপাশি সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে অস্ত্র সরবরাহ, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, এমনকি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়গুলোও আলোচনায় আছে।
দামেস্ক ও আঙ্কারার মধ্যে যে সমঝোতা গড়ে উঠেছে, তাতে তুরস্ক যেসব বিষয়কে নিজের ‘রেড জোন’ হিসেবে দেখে, বিশেষ করে উত্তর সিরিয়া প্রসঙ্গে, সেগুলোতে নীতিগত ঐকমত্য দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে এসডিএফের ওপর চাপ অব্যাহত রাখা এবং তাদের বিরুদ্ধে আঙ্কারার অবস্থানকে সমর্থনের নীতিও বজায় আছে। তবু তুরস্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ফাইলে এখনো পুরোপুরি কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। বরং সময় দীর্ঘ হলে অভ্যন্তরীণ কিংবা আন্তর্জাতিক সমীকরণ বদলে যেতে পারে, যেমন এসডিএফের শক্তি বৃদ্ধি বা তাদের প্রতি মার্কিন প্রশাসনের অবস্থানে পরিবর্তন। এ ধরনের আশঙ্কার কারণে তুরস্ক এখনো কঠোর বিকল্পগুলো হাতে রাখার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলই সিরিয়া ও তুরস্ক উভয়ের জন্য প্রধান হুমকি হিসেবে থেকে যাবে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে তুফানুল আকসা অভিযানের পর এবং আরও স্পষ্টভাবে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পর ইসরায়েলের নিরাপত্তা কৌশলে যে পরিবর্তন এসেছে, তাতে এই উদ্বেগ বেড়েছে। আঙ্কারা ভালোভাবেই জানে, ইসরায়েলের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত সমর্থন আছে এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতা কতটা ব্যাপক। একই সঙ্গে ইসরায়েলও বোঝে, ন্যাটোর সদস্যপদ, শক্তিশালী সেনাবাহিনী ও নিজস্ব সামরিক উৎপাদন সক্ষমতার কারণে তুরস্ক তাদের আগের প্রতিপক্ষদের মতো নয়। তা সত্ত্বেও, বিশেষ করে সিরিয়াকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কিংবা সংঘাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করা যায় না। যদিও আঙ্কারা স্পষ্টভাবে এমন পরিস্থিতি এড়াতে বা অন্তত বিলম্বিত করতে আগ্রহী।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সিরীয় পরিস্থিতির সাম্প্রতিক পরিবর্তনে তুরস্ক এখন পর্যন্ত অন্যতম বড় লাভবান দেশ। তবে অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ ও বহিরাগত হুমকির কারণে এই লাভকে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী কৌশলগত অর্জনে রূপ দিতে দেশটি এখনো পুরোপুরি সক্ষম হয়নি। এই বাস্তবতার কারণে তুরস্ক আরও সমর্থন আদায়, ধৈর্য ধরে এগোনো এবং দামেস্কের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের পথই বেছে নিয়েছে। একই সঙ্গে যৌথ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে সহযোগিতা বাড়িয়ে ধাপে ধাপে ‘লাভ সঞ্চয়ের’ কৌশল নিয়েই এগোতে হচ্ছে আঙ্কারাকে।
সূত্র: আল জাজিরা











