আদর্শ ও শাসন ব্যবস্থা
ইরানে শাহ-এর শাসনব্যবস্থা মূলত জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। তিনি পশ্চিমা ধাঁচের মর্ডানিজমকে গুরুত্ব দেন এবং ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে তুলনামূলক বিভাজন বজায় রাখার চেষ্টা করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল, ইরানকে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তর করা। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকভাবে ও সাংস্কৃতিকভাবে ইরানকে পুরোপুরি পশ্চিমা আদলে গড়ে তোলা।
এর বিপরীতে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে বারো ইমামের শিয়া মতাদর্শ থেকে উদ্ভূত ‘উলায়াতে ফকিহ’ নীতির ওপর। এই ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতাকে ঐশী শরিয়তের প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করা হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধর্মীয় কর্তৃত্বই প্রধান নিয়ামক হয়ে ওঠে।
শাহ-এর আমলে রাষ্ট্রক্ষমতা কার্যত একক ব্যক্তির হাতেই কেন্দ্রীভূত ছিল। যদিও সংসদ ও মন্ত্রিসভাসহ কিছু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বিদ্যমান থাকলেও, সেগুলো ছিল নামমাত্র। ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে শাসন পরিচালিত হতো এবং দমনমূলক নিরাপত্তা বাহিনী, বিশেষ করে কুখ্যাত ‘সাভাক’, এর ওপর নির্ভর করেই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা হয়েছিল।
অন্যদিকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের এক ধরনের সহাবস্থান দেখা যায়। প্রেসিডেন্ট ও সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হলেও বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর চূড়ান্ত প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন সর্বোচ্চ নেতা। তাঁকে এই ক্ষমতা প্রয়োগে সহায়তা করে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এবং সংবিধান রক্ষক পরিষদের মতো প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান।
দমননীতি ও মানবাধিকার
দুই শাসনব্যবস্থাই ছিল কর্তৃত্ববাদী চরিত্রের। শাহ বিরোধী মত দমনে ‘সাভাক’কে ব্যবহার করে হাজারো রাজনৈতিক কর্মী ও বিরোধী নেতাকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করেন। অন্যদিকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র আরও কঠোর আদর্শিক দমননীতি গ্রহণ করে। এ সময় গণ–ফাঁসি, বিরোধীদের ধারাবাহিক নিপীড়ন এবং মতপ্রকাশের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। বিক্ষোভ দমনের নামে নিরাপত্তা বাহিনী, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং বাসিজ মিলিশিয়ারা সহিংসতা চালায়। যার যুক্তি হিসেবে ‘বিপ্লব ও রাষ্ট্র রক্ষা’র কথা তুলে ধরা হয়।
অর্থনীতি ও উন্নয়ন
শাহর শাসনামলে তেলের আয়ে ইরান দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। এর ফলে জীবনমান ও শিক্ষার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। তবে ব্যাপক দুর্নীতি ও সম্পদের বৈষম্য জনমনে ক্ষোভের জন্ম দেয়, যা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বিস্ফোরণে রূপ নেয়। অন্যদিকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সময়কাল জুড়ে যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে মাথাপিছু আয়ের বৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরে প্রায় স্থবির। একই সঙ্গে বেকারত্ব, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলে।
বৈদেশিক সম্পর্ক
পাহলভি শাসনামলে ইরানের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মিত্রতা ছিল এবং বিভিন্ন পশ্চিমা সামরিক ও রাজনৈতিক জোটে যুক্ত হয়। সে সময় মধ্যপ্রাচ্যে আরব জাতীয়তাবাদী সরকারদের বিপরীতে একটি কৌশলগত বলয় গড়ে তুলতে ইরান ‘ইসরায়েল’-এর সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রাখে।
তবে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর তেহরান পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং ‘না পূর্ব, না পশ্চিম’—এই নীতিকে রাষ্ট্রদর্শন হিসেবে গ্রহণ করে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র নিজেকে প্রতিরোধ ও প্রতিরোধ-সমর্থক শক্তির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উপস্থাপন করে এবং প্রকাশ্যভাবে ‘ইসরায়েল’-বিরোধী অবস্থান নেয়। এর ফলে ইরান ক্রমশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে হয়ে পড়ে এবং দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞার চাপ আরও বাড়তে থাকে।
উপসংহার
ইরানের এই দুই শাসনব্যবস্থা কার্যত দুই বিপরীত ধারার প্রতিনিধিত্ব করে। একদিকে ছিল আধুনিকায়নের নামে গড়ে ওঠা একটি রাজতান্ত্রিক শাসন, যা দাঁড়িয়েছিল বাহ্যিক নির্ভরতা ও অভ্যন্তরীণ দমননীতির ওপর । অন্যদিকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র একটি বিপ্লবী ধর্মীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যেখানে আদর্শিক বৈধতা ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব একসঙ্গে মিশে গেছে।
আজ ইরানি জনগণ দাঁড়িয়ে আছেন এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে। একদিকে শাহ আমলের ভারী উত্তরাধিকার, অন্যদিকে ‘উলায়াতে ফকিহ’-এর বন্ধ কাঠামো। এই সমীকরণে দুর্নীতি, দমননীতি ও দীর্ঘস্থায়ী আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা একসঙ্গে জড়িয়ে আছে।
সূত্র: আমাদ











