একটি দেশের মুদ্রা কেবল বিনিময়ের মাধ্যম নয়, বরং তা সংশ্লিষ্ট জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল। নোটের গায়ে খচিত প্রতিটি রেখা ও চিত্র সেই দেশের আত্মপরিচয়কে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরে। সম্প্রতি সিরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন ব্যাংকনোট বাজারে ছেড়েছে, যার প্রথম সিরিজ পহেলা জানুয়ারি ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে প্রচলনে আসছে। এই নয়া মুদ্রার নকশায় প্রতিফলিত হয়েছে সিরিয়ার সমৃদ্ধির স্বপ্ন এবং হাজার বছরের সভ্যতার শেকড়।
ব্যক্তি নয়, প্রাধান্য পেয়েছে প্রকৃতি ও ঐতিহ্য
সিরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘ গবেষণা ও পরিকল্পনার পর এই নোটগুলোর নকশা চূড়ান্ত করেছে। এই সিরিজের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে মানুষের ছবিকে সম্পূর্ণরূপে বর্জন করা হয়েছে। পূর্বের নোটগুলোতে সিরিয়ার বিগত স্বৈরশাসক হাফিজ আল-আসাদ এবং বাশার আল-আসাদের ছবি খচিত ছিলো। এর পরিবর্তে বর্তমান নোটে সিরিয়ার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য এবং কৃষিজ ঐতিহ্যের স্মারকগুলো স্থান পেয়েছে।
নতুন সিরীয় লিরা: নকশা ও প্রতীকের গল্প
সিরিয়ার নতুন ব্যাংকনোট সিরিজের প্রতিটি নোট আলাদা আলাদা ঐতিহাসিক স্মৃতি, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রতিনিধিত্ব করে।

১০ লিরা: দামেস্কের গোলাপ
সবচেয়ে ক্ষুদ্র মূল্যমানের ১০ লিরার নোটে স্থান পেয়েছে বিখ্যাত দামেস্কি গোলাপ (Damask Rose)। এই গোলাপ বিশ্বজুড়ে তার সুগন্ধির জন্য বিখ্যাত। এছাড়াও এটি সিরিয়ার সৌন্দর্যবোধ, আতরশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী সৌরভ-সংস্কৃতির প্রতীক। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দামেস্ক গোলাপ থেকে উৎপাদিত গোলাপজল ও সুগন্ধি সিরীয়দের জীবনের অংশ হয়ে আছে।

২৫ লিরা: তুত ফল ও রেশম
২৫ লিরার নোটে দেখা যায় তুত বা শুঁত ফল ও সংশ্লিষ্ট রেশম শিল্পের ইঙ্গিত। রেশমগুটি পালন ও তুত চাষ সিরিয়ার গ্রামীণ অর্থনীতির একটি প্রাচীন স্তম্ভ। রেশমগুটি পালন এবং রেশম সুতা তৈরির এই আদি শিল্পটি সিরিয়ার গ্রামীণ অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা আজ ব্যাংকনোটের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়ের মূলধারায় ফিরে এসেছে।

৫০ লিরা: কমলালেবু
৫০ লিরার নোটে কমলালেবু ও তার শাখার উপস্থিতি উপকূলীয় লাতাকিয়া ও তারতুস অঞ্চলের কৃষি সমৃদ্ধির প্রতীক। সিরিয়ার সাইট্রাস ফল একসময় ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে পরিচিত নাম ছিল। উজ্জ্বল রঙের এই নোটটি সিরিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলের উর্বরতা এবং এর কৃষিজাত সমৃদ্ধির এক অনন্য প্রতীক।

১০০ লিরা: তুলা
শুভ্র স্বর্ণখ্যাত তুলা সিরীয় অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ। যুদ্ধের আগে তুলা ছিল সিরিয়ার অন্যতম প্রধান রপ্তানি পণ্য, যা শিল্পকারখানা ও কর্মসংস্থানের বড় উৎস ছিল। ২০১১ সালের আগে সিরিয়ার মোট কৃষি রপ্তানির প্রায় ৩০ শতাংশই ছিল তুলা। খনিজ তেল ও গমের পর এটিই ছিল দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের তৃতীয় বৃহত্তম উৎস। দীর্ঘ সময় ধরে সিরিয়া তুলার উন্নত গুণমান ও উচ্চফলনের জন্য অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিল। ফলন এবং উৎপাদন সক্ষমতার নিরিখে এই শ্রেষ্ঠত্বই সিরিয়াকে বিশ্বমঞ্চে এক অগ্রগণ্য অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিল।

২০০ লিরা: যাইতুন
যাইতুন চাষের ইতিহাস সিরিয়ায় হাজার বছরের পুরোনো। সিরিয়া বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন অঞ্চল, যেখানে যাইতুন চাষের সূচনা হয়েছিল। প্রাচীন উগারিট সাম্রাজ্যের (বর্তমান লাতাকিয়া) ধ্বংসাবশেষে যাইতুনের খোদাইকৃত নকশা এর প্রমাণ দেয়। এছাড়া ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় ইবলা অঞ্চলে (বর্তমান ইদলিব) যাইতুনের পরাগরেণুর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা খ্রিস্টপূর্ব ছয় হাজার বছরেরও বেশি পুরনো ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে।
এছাড়াও ২০০০ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে সিরিয়া যাইতুন তেল রপ্তানিতে আরব বিশ্বে প্রথম স্থান অধিকার করেছিল। এই ঐতিহ্যকে ধারণ করেই মুদ্রায় স্থান পেয়েছে যাইতুনের ডাল–যা একই সাথে শান্তি ও প্রাচুর্যের প্রতীক।

৫০০ লিরা: গম
৫০০ লিরার নোটে সোনালি গমের শীষ সিরিয়ার খাদ্য নিরাপত্তার প্রতীক। একসময় সিরিয়া মধ্যপ্রাচ্যের ‘খাদ্যঝুড়ি’ হিসেবে পরিচিত ছিল। যদিও গত এক দশকে যুদ্ধের ডামাডোলে এই উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, তবুও ব্যাংকনোটে গমের এই চিত্রায়ণ মূলত দেশটির ‘খাদ্যঝুড়ি’ পুনর্গঠনের এক দৃঢ় প্রত্যয়।
এছাড়াও প্রত্যেকটি মুদ্রার ঠিক কেন্দ্রে থাকা অষ্টকোণী নকশাটি ‘সেলজুক তারকা’ (Seljuk Star) নামে পরিচিত। এই তারকাটি একটি সূক্ষ্ম জ্যামিতিক নকশার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা মধ্যযুগে গণিত এবং জ্যামিতি শাস্ত্রে মুসলিমদের অসামান্য উৎকর্ষের প্রমাণ। এই তারকাটি সেই মহান সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন দামেস্ক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
টেকসই নকশা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপ
প্রযুক্তিগত দিক থেকেও এই নোটগুলো আধুনিক। এতে প্রথমবারের মতো ‘ব্রেইল’ পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী নাগরিকরা স্বাচ্ছন্দ্যে মুদ্রা শনাক্ত করতে পারেন।
এছাড়া মুদ্রাস্ফীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় হিসাবের জটিলতা কমাতে দুটি শূন্য (০) বাদ দিয়ে মান পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, পুরনো ১০০ সিরীয় লিরা এখন নতুন ১ লিরার সমতুল্য হবে, যা অর্থনীতিতে হিসাবের স্বচ্ছতা আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শেষ কথা
স্বৈরশাসন পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনীতিতে নতুন এই ব্যাংকনোটগুলো হয়তো রাতারাতি কোনো জাদুকরী পরিবর্তন আনবে না। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, মুদ্রার এই রূপান্তরের সাফল্য নির্ভর করবে সিরিয়ার দীর্ঘমেয়াদী উৎপাদন শৃঙ্খলা, স্থিতিশীল মুদ্রানীতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর। তবে মুদ্রার গায়ে এই শৈল্পিক পরিবর্তন এবং ব্যক্তি অপেক্ষা জাতীয় প্রতীককে গুরুত্ব দেওয়া সিরীয়দের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে। ‘শ্বেত স্বর্ণ’ আর ‘সোনালি গমের’ সেই সমৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা দ্রুত ফিরে আসে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।











