মধ্যপ্রাচ্য

মধ্যপ্রাচ্য অর্ডার করতে ক্লিক করুন

প্রেসিডেন্ট আহমাদ আশ শারাকে ঘিরে বিভ্রান্তি বনাম বাস্তবতা

এগুলো কি সবই অভিনয়? সমগ্র সরকার কি অভিনয় করতে পারে?
সিরিয়ার অন্তর্বর্তীকালীনরাষ্ট্রপ্রধান আহমাদ আশ শারা
সিরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান আহমাদ আশ শারা। ছবি : ইনাব বালাদী

কিছু মানুষের মনোভাব দেখে প্রশ্ন জাগে, ফজরের নামাজে যিনি মানুষের ইমামতি করেন, যার সেনারা গাজার পক্ষে স্লোগান তোলে, সেই নেতাকেই কীভাবে আবার ‘আমেরিকার দালাল’ বলা হয়?

আরব বিশ্ব এখন ইতিহাসের অন্যতম অস্থির, পরিবর্তনশীল ও আতঙ্কময় সময় পার করছে। এই অনিশ্চয়তার সময়ে মানুষ এমন যেকোনো কিছুকেই আঁকড়ে ধরতে চায়, যা তাদের মুক্তির সামান্য ইঙ্গিতও দেয়। ইতোমধ্যে দেখা গেছে, ইসরায়েল পুরো অঞ্চলজুড়েই আগ্রাসী আচরণ করে বেড়াচ্ছে, বাদ যাচ্ছে না কোনো আরব দেশই । এমনকি রাজধানী দোহায় হামলা করতেও তাদের দ্বিধা হয়নি। এই বেপরোয়া আচরণ যেমন দম্ভের পরিচয় দেয়, তেমনি ইসরায়েলের ভেতরে জমে থাকা ভয়েরও ইঙ্গিত—অস্তিত্ব হারানোর ভয়।

বাশারের পতনের এক বছর পূর্তিতে সিরীয়দের আয়োজিত অনুষ্ঠানে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে নজর কাড়ে। এসব নিয়ে লেখা মাত্রই পাঠকদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। একদল এখনো কেন আসাদ শাসনের প্রতি আনুগত্য পোষণ করে তা বোঝা কঠিন, বিশেষ করে এমন পতন, এমন লজ্জাজনক পলায়ন আর লুনা আশ শাবলের অপমানজনক অডিওফাঁসের পরও। অপরদিকে একটি গোষ্ঠী নতুন সরকারকে সন্দেহের চোখে দেখে, কেউ বলে আমেরিকানদের দালাল, কেউ বলে ইসরায়েলি, কেউ আবার দায়েশ। এসবই মূলত কোনো প্রমাণ ছাড়াই অযাচিত অভিযোগ।

আমি শুধু একজন পাঠক-বিশ্লেষক হিসেবে কয়েকটি দিক তুলে ধরতে চাই। গায়েব জানি না, বিশেষ কোনো মর্যাদা দাবি করি না। তবে যুক্তি ও বিবেক দিয়ে বিষয়গুলো দেখার চেষ্টা করি। গালিগালাজে অভ্যস্তদের বহুবার বলেছি—আমার বিশ্লেষণ ঠিকও হতে পারে, ভুলও হতে পারে; কিন্তু তা অবশ্যই নির্ভরযোগ্য সংবাদ, বাস্তব অবস্থা ও প্রমাণের ওপরে দাঁড়ানো। অন্যদিকে যাঁরা ‘গাদ্দার’ বলে দোষারোপ করেন, তাঁদের বক্তব্য বাতাসে ছোড়া শব্দ ছাড়া আর কিছু নয়।

এবার নিরপেক্ষভাবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখা যাক,

• বিপ্লবের প্রতীক সামরিক পোশাক পরে আহমাদ আশ শারার সরকারি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া, জনমনে ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করেছে।

• দামেস্কের রাস্তায় হাজারো যোদ্ধা নিয়ে সিরীয় সেনাবাহিনীর মিছিল, গাজার পক্ষে স্লোগান এবং ইসরায়েলকে হুঁশিয়ারি ইসরায়েলকে রীতিমতো ক্ষুব্ধ করেছে।

• উমাইয়া মসজিদে আহমাদ আশ শারার ফজরের নামাজে ইমামতি, তাঁর সাবলীল তিলাওয়াত মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে।

• উত্তর আলেপ্পো থেকে রাজধানী হয়ে দারআ পর্যন্ত লাখো মানুষের সমাগম—নতুন নেতৃত্বের প্রতি জাতীয় ঐক্যের ইঙ্গিত।

• আগের শাসনের কারাগার থেকে মুক্ত মানুষ, আহত ও নিপীড়িতদের সঙ্গে আহমাদ আশ শারা ও তাঁর সহকর্মীদের সাক্ষাৎ, আর তাঁদের বক্তব্য শুনে নেতা-মন্ত্রীদের কান্নায় ভেঙে পড়া—এগুলো কি সবই অভিনয়? সমগ্র সরকার কি অভিনয় করতে পারে?

• প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ইসরায়েলকে আঞ্চলিক ‘বেপরোয়া শক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করা, যা সিরিয়ার ধৈর্য ক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়।

• শত শত কর্মকর্তা, মন্ত্রী, সামরিক নেতা ও হাজারো সেনা সবার রাজনৈতিক অবস্থান, আচরণ, ইবাদতের অনুশীলন, জনসম্মুখে ভাষা—সবই এক ধারার। এতো মানুষ একসঙ্গে ‘দালাল’ হওয়া কি সম্ভব?

দৃশ্যত স্পষ্ট, সিরিয়ায় এমন একটি রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যার আদর্শ ইসলামি। যাদের শাসনদর্শন বহু দেশের চেয়ে আলাদা। তবু কেন ইসলামী শাসনের ধারণা এলেই কিছু মানুষ ভয় পায়?

ইসরায়েল কি ধর্মভিত্তিক শাসন নয়?

ইউরোপ কি বহু বছর ধর্মীয় দলগুলোর নেতৃত্বে শাসিত হয়নি?

ইউরোপের অসংখ্য দেশের পতাকায় তো এখনো ক্রস রয়েছে।

তাহলে ইউরোপ-আমেরিকায় ধর্মীয় শাসন ‘অগ্রগতি’, আর সিরিয়ায় হলে ‘পশ্চাদপদতা’ কেন?

এবার আসা যাক কিছু সাধারণ প্রশ্নে,

• ‘আহমাদ আশ শারা এখন পর্যন্ত কী করেছে?’—এই প্রশ্ন বিজয়ের প্রথম দিন থেকেই। পুরোনো শাসন তো ষাট বছর সময় পেয়েছে‌। নতুন সরকারকে কি ষাট মাসও দেওয়া হবে না?

• ‘কেন ইসরায়েলি হামলার জবাব দিচ্ছে না?’—যে দেশটি তিনি পেয়েছেন, সেখানে নেই সেনাবাহিনী, নেই অস্ত্রশস্ত্র। আসাদের শাসনামলেও তো ইসরায়েল বোমা মেরেছে, ঘাঁটি টহল দিয়েছে, রাডার খুলে নিয়ে গেছে। তখন তো কেউ বিশ্বাসঘাতকতা বলেনি।

• ‘আহমাদ আশ শারা দায়েশ’—গতকাল পর্যন্ত তো বলা হচ্ছিল দায়েশ নেই, সব বানানো গল্প। আজ তিনি হঠাৎ দায়েশ হয়ে গেলেন? একজন ‘সন্ত্রাসী’ নাকি পুরো বিপ্লব পরিচালনা করল, স্বৈরাচারী শাসন উত্খাত করল, আর আজ সিরীয়দের মুখে হাসি ফিরল—তাহলে কি পুরো জাতিই ‘গাদ্দার’?

• ‘তিনি আমেরিকায় গেছেন’ এ অভিযোগের ভিত্তিই বা কী? পৃথিবীর প্রায় সব দেশের প্রধানই যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন।

• ‘তিনি ইরান ও হিজবুল্লাহকে বের করে দিয়েছেন’—ইরান তো আসাদ পতনের আগেই বেরিয়ে গিয়েছিল। কারণ আসাদের শেষ দুই বছরের বেপরোয়া আচরণে তারাই বিরক্ত ছিল।

সর্বশেষে বলা যায়, প্রতিটি বিষয়ে আলাপ-আলোচনার সুযোগ থাকা উচিত। কিন্তু কাউকে গালিগালাজ করলেই সবকিছু মীমাংসা হয়ে যায় না। সিরিয়ার তাতে কিছুই যায় আসে না। তাদের কর্মসূচি, লক্ষ্য ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট এবং যথেষ্ট শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

আমি যা দেখেছি, শুনেছি ও পর্যবেক্ষণ করেছি তা তুলে ধরেছি। বিরোধীদের বক্তব্যও রেখেছি।

সত্য কোথায়, সেটা আলোচনার বিষয়। সিরিয়া বহুবার আলোচনার দাবি রাখে। প্রতিটি আরব দেশই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আলাপ করি বোঝার জন্য, নিন্দা করার জন্য নয়।

জর্ডানের একজন সামরিক বিশ্লষকের লেখা কলামের অনুবাদ