মধ্যপ্রাচ্য

মধ্যপ্রাচ্য অর্ডার করতে ক্লিক করুন

অধিকাংশ নেতার শাহাদাতের পরও যেসব কারণে হামাসকে ধ্বংস করা যাবে না 

হামাস একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে, যেখানে ক্ষমতার বণ্টন থাকে বহু স্তরে।
অধিকাংশ নেতার শাহাদাতের পরও যেসব কারণে হামাসকে ধ্বংস করা যাবে না 
অধিকাংশ নেতার শাহাদাতের পরও যেসব কারণে হামাসকে ধ্বংস করা যাবে ন। ছবি : সংগৃহীত

গত কয়েক দিন আগে হামাসের সামরিক শাখা কাসসাম ব্রিগেড তাদের একঝাঁক শীর্ষ নেতার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। এই তালিকায় রয়েছেন চীফ অফ স্টাফ মুহাম্মদ আল-সিনওয়ার, রাফাহ ব্রিগেডের কমান্ডার মুহাম্মদ শাবানা, উৎপাদন ও অপারেশন ইউনিটের সাবেক প্রধান রায়েদ সাদ এবং অস্ত্র ও লজিস্টিক ইউনিটের প্রধান হাকাম আল-ইসা। এছাড়াও রয়েছেন কাসসাম ব্রিগেডের সুপরিচিত মুখপাত্র হুজাইফা আল-কাহলুত ওরফে আবু উবায়দা।

​একই সঙ্গে কাসসাম ব্রিগেড একজন নতুন সামরিক মুখপাত্র নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে, যিনি পূর্বসূরীর সেই ‘আবু উবায়দা’ উপনামটিই ব্যবহার করবেন। হামাসের পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট বার্তা হলো, তাদের গণমাধ্যম ও প্রচারণার কৌশল নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে।

​২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে কাসসাম ব্রিগেডের এই উচ্চপর্যায়ের নেতাদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে অনুরূপ ঘোষণা এসেছে। বিশেষ করে যুদ্ধবিরতির সময় যখন সংগঠনের ঐতিহাসিক কমান্ডার মুহাম্মদ দাইফের শাহাদাতের খবর আসে, তখন তা বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা হয়েছিল।

​ইসরায়েলি এই গুপ্তহত্যার পরিধি ফিলিস্তিনের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৪ সালের শুরুতে বৈরুতে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর উপ-প্রধান সালেহ আল-আরুরিকে হত্যার মধ্য দিয়ে এই গুপ্তহত্যা শুরু হয়। এরপর বছরের মাঝামাঝি সময়ে তেহরানে ইসরায়েলি অভিযানে প্রাণ হারান ইসমাইল হানিয়া। পরবর্তীতে রাফাহতে তার উত্তরসূরি ইয়াহিয়া সিনওয়ার এবং সবশেষে ২০২৫ সালে দোহায় মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনারত অবস্থায় হামাস শীর্ষ নেতাদের ওপর হামলা চালানো হয়।

​ইসরায়েলের এই পদ্ধতিগত নীতি মূলত হামাসের শীর্ষ এবং মধ্যম পর্যায়ের নেতৃত্বকে নির্মূল করে সংগঠনটির সাংগঠনিক ও নেতৃত্ব কাঠামো ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যেই পরিচালিত। এর পাশাপাশি গাজায় সাধারণ মানুষের ওপর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে একটি জনবিচ্ছিন্ন পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে, যেখানে এ পর্যন্ত ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষ শহিদ এবং প্রায় ১০ হাজার নিখোঁজ হয়েছেন। ইসরায়েলের ধারণা, হামাসের জনসমর্থন ধ্বংস করতে পারলে তাদের টিকে থাকার ক্ষমতাও শেষ হয়ে যাবে।

​এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, নেতৃত্বের এই নজিরবিহীন শূন্যতা হামাসের সামরিক, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সক্ষমতাকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে? বিশেষ করে যখন গাজা যুদ্ধের প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং হামাসের মিত্র দেশগুলোর ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে এসব ঘটনার ফলে হামাসের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা ও কৌশলগত বিকল্পগুলো কীভাবে প্রভাবিত হতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিশেষত যখন নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সামনে এসেছে, আর তুফানুল আকসা যুদ্ধের অভিঘাত গাজার গণ্ডি ছাড়িয়ে হামাসের আঞ্চলিক মিত্র ও সমর্থক-কাঠামোকেও প্রভাবিত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্নগুলো আরও নিরপেক্ষ ও গভীরভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

​মার্কিন গোয়েন্দা দৃষ্টিভঙ্গি ও তাত্ত্বিক কাঠামো

​এই বিশ্লেষণের ভিত্তি হিসেবে পশ্চিমা দেশগুলোর, বিশেষ করে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA) এর একটি গোপন নথিকে ব্যবহার করা হয়েছে। উইকিলিকসে ফাঁস হওয়া ‘হাই ভ্যালু টার্গেটিং’ (High Value Targeting) শীর্ষক এই গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো সশস্ত্র সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করলেই সেই সংগঠন সবসময় শেষ হয়ে যায় না। এর ফলাফল নির্ভর করে ওই সংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামো এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ধরনের ওপর।

​সিআইএ-র এই গোপন গবেষণা (১৯৮৩-২০০৯) আলজেরিয়া, ইরাক, ফিলিস্তিন থেকে শুরু করে আয়ারল্যান্ড ও চেচনিয়ার মতো বিভিন্ন অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীর অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। সেখানে দেখা গেছে, গুপ্তহত্যা তখনই সফল হয় যখন এটি একটি বৃহত্তর সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হয়।

​হামাসের ক্ষেত্রে ইসরায়েলি এই নীতি মূলত সাংগঠনিক শক্তি হ্রাস এবং জনবল নিয়োগের ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও লজিস্টিক পর্যায়ে সাময়িক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে, যা সংগঠনকে আরও বেশি গোপনীয়তা অবলম্বনে বাধ্য করে। তবে ইসরায়েলের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেয়ার বিন শাব্বাত স্বীকার করেছে, গাজায় মাঠ পর্যায়ের নেতৃত্বকে নির্মূল করলেও হামাসের কার্যকারিতা শেষ হয়নি। বরং সংগঠনের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এখন বিদেশের নেতৃত্বের কাছে চলে গেছে, যারা একটি ‘রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক জেনারেল স্টাফ’ হিসেবে কাজ করছে।

​নেতৃত্বের বিন্যাস ও টিকে থাকার কৌশল

​হামাস মূলত একটি বিকেন্দ্রীভূত (Decentralized) সাংগঠনিক কাঠামো অনুসরণ করে। মার্কিন তাত্ত্বিকদের মতে, যেসব সংগঠন কোনো একক ব্যক্তির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল, তারা নেতা হারালে দ্রুত ভেঙে পড়ে। কিন্তু হামাস একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে, যেখানে ক্ষমতার বণ্টন থাকে বহু স্তরে।

​এর প্রমাণ পাওয়া যায় ২০০৪ সালে মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে শায়খ আহমদ ইয়াসিন এবং আব্দুল আজিজ রানতিসিকে হত্যার পর। তখন সবাই ভেবেছিল হামাস শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু সংগঠনটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। বর্তমান সময়েও ইসমাইল হানিয়ার পর সিনওয়ার এবং সিনওয়ারের পর একটি যৌথ নেতৃত্ব (Collective Leadership) গঠন করা হামাসের সাংগঠনিক পরিপক্কতারই প্রমাণ।

​তবে বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। ইসরায়েল এবার শুধু নেতাদের নয়, বরং গাজার পুরো সামাজিক কাঠামো ও অবকাঠামো ধ্বংস করে দিচ্ছে। এটি হামাসের জন্য দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে, কারণ তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং জনসমর্থনের মূল ভিত্তি-ই এখন হুমকির মুখে।

​ঘোষণার কৌশল ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াই

​ইসরায়েল এবং হামাসের মধ্যে নেতাদের মৃত্যুর ঘোষণা নিয়ে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চলে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বা সামরিক প্রধানরা দ্রুত বিজয়ের ঘোষণা দিতে চান যাতে ঘরোয়া রাজনীতিতে নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়ানো যায় এবং ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতা ঢাকা যায়।

​অন্যদিকে হামাস নেতাদের মৃত্যুর খবর প্রকাশে সময় নেয়। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের বিকল্প ব্যবস্থা করার পর তবেই ঘোষণা দেয়। এটি করা হয় যাতে সংগঠনের কর্মীদের মধ্যে তাৎক্ষণিক কোনো হতাশা বা বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়।

​ইসরায়েলের দীর্ঘস্থায়ী সংকট

​ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ইসরায়েলের এই গুপ্তহত্যার নীতি প্রায়ই হিতে বিপরীত হয়েছে। আশির দশকে ফাতাহ আন্দোলনের দ্বিতীয় প্রধান নেতা খলিল আল-ওয়াজিরকে (আবু জিহাদ) হত্যার ফলে ফাতাহ দুর্বল হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তার শূন্যস্থানেই হামাস ও ইসলামিক জিহাদের মতো আরও রক্ষণশীল ইসলামি আন্দোলনের উত্থান ঘটে।

এই একই চিত্র দেখা গেছে দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময়ও। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে শায়খ আহমদ ইয়াসিনসহ হামাসের প্রতিষ্ঠাতা ও শীর্ষ নেতাদের একের পর এক হত্যার ঘটনা সংগঠনটিকে দমানোর পরিবর্তে আরও শক্তিশালী করেছে। এটি জনমনে হামাসকে এমন এক অপরাজেয় সংগঠনে রূপ দিয়েছে, যাদের নেতৃত্বকে হত্যা করা গেলেও ইচ্ছাশক্তি ভাঙা বা আপসকামিতার দিকে ঠেলে দেওয়া সম্ভব নয়। এই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটে ২০০৬ সালের ফিলিস্তিন আইনসভা নির্বাচনে হামাসের বিজয়। এই ফলাফল ছিল ইসরায়েলি নেতৃত্বের সেই হিসাব-নিকাশের ঠিক উল্টো। ইসরায়েল ভেবেছিল গুপ্তহত্যার মাধ্যমে সংগঠনটিকে রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু বা নিশ্চিহ্ন করা যাবে।

​ইসরায়েলি সাংবাদিক রোনেন বার্গম্যান তার ‘রাইজ অ্যান্ড কিল ফার্স্ট’ (Rise and Kill First) বইয়ে লিখেছেন, গুপ্তহত্যাগুলো তাৎক্ষণিক কিছু হুমকি দূর করতে পারলেও ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং এটি প্রমাণ করেছে, একটি সামগ্রিক রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প হিসেবে গুপ্তহত্যা কোনো কার্যকর হাতিয়ার নয়।

এই প্রেক্ষাপটে সামগ্রিক অভিজ্ঞতা এটাই বলে, যখন কোনো আদর্শ বা সংগঠন সামাজিক বৈধতা পায় এবং অধিকার আদায়ে বদ্ধপরিকর একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর সমর্থন লাভ করে, তখন নিহত নেতারা একেকজন জাতীয় প্রতীকে পরিণত হন এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে লড়াইয়ের অনুপ্রেরণাদায়ক আইকন হয়ে উঠেন। এর ফলে লক্ষ্যবস্তু হওয়া আদর্শ বা সংগঠনটি ভেঙে পড়ার বদলে আরও নতুন নেতৃত্বের জন্ম দেয়। ফলে গুপ্তহত্যার এই রাজনীতি সংঘাতের অবসান ঘটায় না, বরং একে নিত্যনতুন রূপ ও পথে পুনঃপ্রবাহিত করে।

​একইসঙ্গে বর্তমানে বিভিন্ন ফ্রন্টে সংঘাতের বিস্তার এবং ভৌগোলিক ব্যাপ্তি ইসরায়েলিদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার ভয়কে চিরস্থায়ী করে তুলেছে। কোনো সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বা কৌশলগত সাফল্য এখনও পর্যন্ত ইসরায়েলিদের জন্য একটি স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারেনি। এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, ইসরায়েলের কাপুরুষোচিত গুপ্তহত্যা যত ব্যাপকই হোক না কেন, তা কেবল সংঘাত পরিচালনার একটি মাধ্যম মাত্র, এটি সংঘাত মীমাংসার কোনো চূড়ান্ত উপায় নয়। আর হামাসের শীর্ষ নেতৃত্ব হারানো নিঃসন্দেহে একটি বড় ধাক্কা, কিন্তু সংগঠনটির দীর্ঘ ইতিহাস এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বলে দিচ্ছে, তারা সহজে বিলুপ্ত হওয়ার নয়।