কে এই আবু উবায়দা, কীভাবে হয়ে উঠলেন উম্মাহর কণ্ঠস্বর 

দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে আবু উবায়দার প্রকৃত নাম ও পরিচয় ছিল গোপন। পর্দায় কখনো তাঁর মুখ দেখা যায়নি।
হুজাইফা আল কাহলুত ওরফে উবায়দা

লাল কুফিয়া আর সবুজ হেডব্যান্ডে, পর্দায় হাজির হয়ে যখনই তিনি বক্তব্য দিতেন, তখন তাঁর চেহারার চেয়ে বেশি আলোচনায় আসত তীক্ষ্ণ সেই কণ্ঠ। সেই কণ্ঠই বারবার কাঁপন ধরিয়েছে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে। এই পরিচয়েই পরিচিত ছিলেন আবু উবায়দা, ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের সামরিক শাখা কাসসাম ব্রিগেডের মুখপাত্র।

আবু উবায়দা কোনো সাধারণ ছদ্মনাম ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নামটি পরিণত হয় এক শক্তিশালী প্রতীকে। গত ২১ বছরে কাসসাম ব্রিগেডের সামরিক বার্তা, প্রতিরোধের অবস্থান এবং গাজায় সংঘটিত বড় বড় অভিযানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায় তাঁর নাম। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের মুখে ‘ইসরায়েল’ ও তাদের সেনাবাহিনীর ব্যর্থতার স্মারক হিসেবেও তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন।

অনেকেই তাঁকে ডাকতেন ‘মুখোশধারী’ নামে। ২০০৬ সালের ২৫ জুন প্রথমবার প্রকাশ্যে তাঁর উপস্থিতি চোখে পড়ে। সেদিন তিনি প্রতিরোধের পক্ষ থেকে ‘আল অহমুল মুতাবাদ্দিদ’ অভিযানের ঘোষণা দেন। ওই অভিযানে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হয় এবং ইসরায়েলি সেনা গিলাদ শালিতকে আটক করা হয়। এই ঘটনাই আবু উবায়দাকে প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত করে তোলে।

দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে আবু উবায়দার প্রকৃত নাম ও পরিচয় ছিল গোপন। পর্দায় কখনো তাঁর মুখ দেখা যায়নি। তবু প্রতিবার যখন তাঁর কণ্ঠ ভেসে আসত, সেটাই ‘ইসরায়েল’-এর জন্য ছিল অস্বস্তি ও আতঙ্কের কারণ। দৃশ্যমান উপস্থিতি ছাড়াই, শুধু কণ্ঠ আর বক্তব্যের শক্তিতেই তিনি এক কিংবদন্তী প্রতীকে পরিণত হন।

শৈশব ও শিক্ষা

হুজাইফা সামির আল কাহলুত ১৯৮৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে জন্মগ্রহণ করেন। এবং এ শিবিরেই বেড়ে উঠেন। ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের ত্রাণ ও কর্মসংস্থান সংস্থা উনরওয়ার পরিচালিত বিদ্যালয়গুলোতেই তার পড়াশোনা।

উত্তর গাজা উপত্যকার আহমদ আশ শুকাইরি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি হামাসের ছাত্র সংগঠন ইসলামিক ব্লকের কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন।

২০০২ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। এরপর প্রকৌশল বিষয়ে উচ্চশিক্ষা শুরু করেন। পরে বিষয় পরিবর্তন করে উসুলুদ্দিন অনুষদে ভর্তি হন।

২০১৩ সালে গাজা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের উসুলুদ্দিন অনুষদের আকিদা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। তার গবেষণাপত্রের শিরোনাম ছিল ‘ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের পবিত্র ভূমি’।

দ্বিতীয় ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদা শুরুর সময়, ২০০০ সাল থেকেই ‘আবু উবায়দা’ হামাস আন্দোলন ও তার সামরিক শাখায় যুক্ত হন। কাসসাম ব্রিগেডের ভেতরে তিনি ধাপে ধাপে দায়িত্ব পালন করেন এবং মাঠপর্যায়ের পাশাপাশি গণমাধ্যমসংক্রান্ত কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

মিডিয়ায় ভূমিকা

২০০৪ সালের অক্টোবর মাসে উত্তর গাজা উপত্যকার ‘নূর’ মসজিদ থেকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রথমবার প্রকাশ্যে আসেন আবু উবায়দা। তখন চলছিল ‘আইয়ামুল গাদাব’ নামে পরিচিত অভিযান। উত্তর গাজায় দখলদার বাহিনীর হামলার জবাবে প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো এই লড়াই শুরু করেছিল।

তখন থেকেই তিনি কাসসাম ব্রিগেডের প্রধান মিডিয়া মুখ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। সামরিক অভিযান ঘোষণা বা ইসরায়েলি অনুপ্রবেশ প্রতিহত করার বিষয়ে কাসসামের বক্তব্য নিয়মিতভাবে তাঁর কণ্ঠেই শোনা যেত।

কাসসামের সামরিক মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন আবু উবায়দা। তিনি কাসসাম ব্রিগেডের সর্বাধিনায়ক শহিদ মুহাম্মদ দাইফের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

২০০৫ সালে গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পর আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি কাসসাম ব্রিগেডের মুখপাত্রের দায়িত্ব নেন। একই সময় আল জাজিরা টেলিভিশনের ‘ফি দিয়া‌ফাত আল বন্দুকিয়া’ অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি নজর কাড়ে।

সামরিক মিডিয়া বিভাগের প্রধান হিসেবে তিনি একাধিক শাখার তত্ত্বাবধান করতেন। এর মধ্যে ছিল নথিপত্র সংরক্ষণ ও ভিডিও ধারণ, মনস্তাত্ত্বিক কার্যক্রম, বিভিন্ন মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা, লিখিত ও ভিডিও বার্তা প্রকাশ।

ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পর কাসসামের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে তিনি আরব ও স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যম, পত্রিকা, সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইটে একাধিক সাক্ষাৎকার দেন। 

সামরিক মুখপাত্র হিসেবে ভূমিকা

২০০৮-২০০৯ সালে গাজা উপত্যকায় ‘ফুরকান’ যুদ্ধ শুরু হলে প্রথমবারের মতো সামরিক মুখপাত্র হিসেবে সামনে আসেন আবু উবাইদা। চলমান যুদ্ধের মুখপাত্র হিসেবে তিনিই হয়ে ওঠেন প্রতিরোধের আনুষ্ঠানিক কণ্ঠস্বর। নিয়মিত বিবৃতির মাধ্যমে তিনি দখলদার বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতির তথ্য জানাতেন, মাঠপর্যায়ে প্রতিরোধের অর্জন তুলে ধরতেন। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ফ্রন্ট এবং আরব জনগণের উদ্দেশে বার্তাও দিতেন।

২০১৪ সালে গাজায় ‘আসফুল মাকুল’ যুদ্ধ আবু উবায়দার উপস্থিতিকে আরও জোরালো করে তোলে। এই যুদ্ধে তাঁর সামরিক বিবৃতিগুলো ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। ওই বছরের জুলাই মাসে দেওয়া তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ বিশেষ গুরুত্ব পায়। সেখানে তিনি পূর্ব গাজার শুজাইয়া এলাকায় ইসরায়েলি সেনা শাউল আরনকে আটক করার ঘোষণা দেন।

ওই সময় দখলদার কর্তৃপক্ষ আবু উবায়দার উপস্থিতি, প্রতীকী গুরুত্ব এবং প্রতিরোধ যোদ্ধাদের মানসিকতায় তাঁর প্রভাব উপলব্ধি করে। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে একটি প্রচার অভিযান চালানো হয়। সেই অভিযানে তাঁর পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের দাবি করা হয়।

২০২০ সালের এপ্রিল মাসে কাসসাম ব্রিগেড টেলিগ্রাম অ্যাপে একটি বিশেষ চ্যানেল চালু করে। এর নাম দেওয়া হয় কাসসাম ব্রিগেডসের সামরিক মুখপাত্র আবু উবায়দা। এই চ্যানেলটি তাঁর বক্তব্য, বিবৃতি এবং লিখিত বার্তা প্রচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই চ্যানেলটির অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ১০ লাখে পৌঁছে যায়।

গাজা উপত্যকায় দখলদার বাহিনীর চালানো বিভিন্ন যুদ্ধে আবু উবায়দার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তিনি নিয়মিত সংক্ষিপ্ত লিখিত বার্তা ও পোস্টের মাধ্যমে ফিলিস্তিন পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য তুলে ধরতেন। একই সঙ্গে আল আকসা মসজিদ এবং দখলকৃত জেরুজালেমে দখলদার বাহিনী ও বসতিস্থাপনকারীদের হামলার প্রসঙ্গ আনতেন। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে নেওয়া তাদের পদক্ষেপ ও আচরণ নিয়েও তিনি কথা বলতেন। এসব হামলার জবাবে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিতও দিতেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া ‘তুফানুল আকসা’ অভিযান, যা টানা দুই বছর ধরে চলে, সেই সময়ে আবু উবায়দা ময়দানের কণ্ঠস্বর ও ঘটনাপ্রবাহের প্রধান প্রতীকে পরিণত হন।

২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় কাসসাম ব্রিগেডের মুখপাত্র হিসেবে আবু উবায়দার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তারা তাঁর কর্মকাণ্ডকে তাদের ভাষায় ‘সন্ত্রাসবাদে সহায়তা’ হিসেবে উল্লেখ করে।

প্রতিরোধ ও ফিলিস্তিনি ইস্যুর কণ্ঠস্বর

দীর্ঘ ২১ বছর ধরে আবু উবায়দা গাজা ও ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের অন্যতম কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে বাস্তবতা ও ময়দানের সত্য চিত্র। বিশেষ করে গাজা থেকে নিজেদের বন্দিদের উদ্ধারে দখলদার বাহিনীর ব্যর্থ অভিযান, বিমান হামলায় বন্দিদের নিহত হওয়ার তথ্য, পাশাপাশি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিরোধ বাহিনীর অভিযান ও দখলদার সেনাদের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে তাঁর ঘোষণাগুলো ব্যাপক গুরুত্ব পেয়েছে।

ইসরায়েলি অপরাধ ও ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর আগ্রাসনের জবাবে হুমকি, সতর্কবার্তা ও প্রতিশোধের অঙ্গীকারের সঙ্গে তাঁর উপস্থিতি ক্রমে একাকার হয়ে যায়। এর ফলে তাঁর ব্যক্তিত্ব দখলদার ইসরায়েলের ধারাবাহিক উসকানির প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। কাসসাম ব্রিগেড ও দখলদার বাহিনীর মধ্যে চলমান বয়ানের যুদ্ধে তিনি হয়ে ওঠেন একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র।

এমনকি ইসরায়েলিরাও তাঁর আবির্ভাবের অপেক্ষায় থাকত ভয় ও শঙ্কার মিশ্র অনুভূতি নিয়ে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কিংবা নিরাপত্তা ও সামরিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্যের চেয়ে আবু উবায়দার কথাকে বেশি বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করত।

আবু উবায়দা নামটি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই নয়, দখলদার ইসরায়েলের অভ্যন্তরেও, একই সঙ্গে ফিলিস্তিন, আরব ও মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত ও উচ্চারিত নামগুলোর একটিতে পরিণত হয়।

তাঁর বক্তব্য ও ভাষণ গাজা উপত্যকা এবং আরব ও মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক আগ্রহ ও গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করা হতো। একই সঙ্গে দখলদার বাহিনীও তাঁর প্রতিটি বক্তব্যকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করত।

বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে আরব বিশ্বে, তাঁর উপস্থিতি ও জনপ্রিয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লাল কুফিয়া ও সামরিক পোশাকে তাঁর আবির্ভাব একটি প্রতীকে পরিণত হয়। এমন এক ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি গড়ে ওঠে, যাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্মরণে রেখেছে। যাকে নিয়ে মানুষ গান গেয়েছে এবং গাজা ও ফিলিস্তিনের পক্ষে সংহতি সমাবেশ ও মিছিলে স্লোগান তুলেছে।

বিশ্বজুড়ে আবু উবায়দাকে প্রতিরোধ ও ফিলিস্তিনি ইস্যুর কণ্ঠস্বর হিসেবেই দেখা হয়েছে। দখলদারত্বের নিচে বসবাসরত নিজের জনগণের বার্তা তুলে ধরতে এবং নিজেদের ইস্যুর পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা রাখতে তিনি ছিলেন নিরলস।

আবু উবায়দার সর্বশেষ উপস্থিতি ছিল ১৮ জুলাই ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায়। সেখানে তিনি বলেন, ফিলিস্তিনি ফ্রন্টগুলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালাতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

ব্যক্তিগত জীবনে আবু উবায়দা ছিলেন বিবাহিত। তাঁর দুই ছেলে ও দুই মেয়ে ছিল। তাঁদের মধ্যে স্ত্রীসহ তিন সন্তান তাঁর ওপর চালানো হত্যাকাণ্ডে শহীদ হন। তারা হলো লিয়ান (১৫), মান্নাতুল্লাহ (১১) এবং ইয়ামান (৭)। বেঁচে থাকেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ইব্রাহিম।

২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট দখলদার বাহিনীর যুদ্ধবিমান গাজা নগরীর পশ্চিমে রিমাল এলাকায় আবু উবাইদাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। অবশেষে ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর কাসসাম ব্রিগেড আবু উবায়দার শাহাদাতের ঘোষণা দেয়।