এক বছর আগে শুরু হওয়া সিরিয়ার প্রতিরোধ যোদ্ধাদের ‘রদউল উদওয়ান’ বা আগ্রাসন প্রতিরোধ অভিযানে সামরিক অগ্রগতির পাশাপাশি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তৎপরতাও ছিল সমান গুরুত্বের। জটিল আন্তর্জাতিক সমঝোতার ভেতর পরিচালিত এই অভিযান বিশেষত আঙ্কারা-মস্কো সম্পর্কের সূক্ষ্ম সমীকরণকে দৃশ্যপটে হাজির করেছে। সে কারণে মাঠের পরিস্থিতি থেকে শুরু করে আঞ্চলিক কূটনীতির প্রতিটি পর্বেই তুরস্ক ও কাতারের ভূমিকা স্বাভাবিকভাবেই হয়ে উঠে আরও উল্লেখযোগ্য।
সিরিয়া প্রসঙ্গে তুরস্ক ও কাতারের উপস্থিতি নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরে তুরস্ক সিরিয়ার বিপ্লবের উল্লেখযোগ্য সমর্থক এবং লাখো শরণার্থীর প্রধান আশ্রয়দাতা। অভিযানের ঠিক আগে আঙ্কারা দামেস্কের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালালেও, বিপ্লব প্রসঙ্গে তাদের মূল অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। অন্যদিকে ২০১১ সাল থেকেই কাতারের অবস্থান ছিল একই—্ সিরিয়ার বিপ্লবের প্রতি সমর্থন এবং বাশার আল আসাদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন না করা।
২৭ নভেম্বর থেকে ৮ ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত ‘রদউল উদওয়ান’ অভিযান চলাকালে তুরস্ক ও কাতারের এই নানামাত্রিক ভূমিকা নিয়েই এই প্রতিবেদন। অভিযানের ফলাফল শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ায় বাশার আল আসাদ সরকারের পতনে। তবে অভিযান পরিচালনায় যুক্ত দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জোর দিয়ে বলেছেন, অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত পুরোপুরি সিরিয়ানদের নিজস্ব, এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোনো আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক সহায়তা ও সমর্থনের উপর ভরসা না করেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
আঙ্কারা: নজরদারি ও ক্ষতি কমানোর হিসাব
উত্তর সিরিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে শক্ত অবস্থান ছিলো তুরস্কের। কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ)-এর বিরুদ্ধে সিরিয়ান ন্যাশনাল আর্মির সঙ্গে মিলে তারা তিনটি বড় সামরিক অভিযানও চালায়। ২০১৬ সালে ‘ইউফ্রেটিস শিল্ড’, ২০১৮ সালে ‘অলিভ ব্রাঞ্চ’ এবং ২০১৯ সালের ‘পিস স্প্রিং’। একই সঙ্গে ‘পিকেকে’র শীর্ষ নেতাদের টার্গেট করে হামলা, সামরিক ঘাঁটি ও জ্বালানি স্থাপনায় অভিযান অব্যাহত ছিল।
জুলাই ২০২৪ পর্যন্ত উত্তরাঞ্চলে তুরস্কের মোট সামরিক ঘাঁটির সংখ্যা দাঁড়ায় ১২৬। এর মধ্যে ৫৮টি আলেপ্পো অঞ্চলে, ৫১টি ইদলিবে, ১০টি রাক্কায় ও চারটি হাসাকায়। লাতাকিয়ার গ্রামীণ এলাকায় দুটি এবং হামায় রয়েছে একটি।
‘মিলিটারি অপারেশনস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’-এর অধীনে ‘হাইআত তাহরির আশ শাম’, ‘জাইশুল ইজ্জাহ’ এবং ‘ন্যাশনাল আর্মি’র বিভিন্ন ইউনিটসহ একাধিক গোষ্ঠী একত্র হয়ে শুরু করে ‘রদউল উদওয়ান’ অভিযান। লক্ষ্য ছিল আসাদ বাহিনী ও তার মিত্র মিলিশিয়াদের ঘাঁটিতে আঘাত হানা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষকে তাদের এলাকায় ফিরিয়ে আনা। ক্রমেই অভিযান বিস্তৃত হয়, গতি পায়, আর তার ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে আসাদের ক্ষমতার ভিত্তি।
যুদ্ধ শুরু হতেই ধারণা তৈরি হয় যে, আঙ্কারা এ অভিযানে ‘সবুজ সংকেত’ দিয়েছে। তুরস্কের পক্ষ থেকে অবশ্য এ নিয়ে সন্তুষ্টির ইঙ্গিতও ছিল। তবে প্রথমদিকে আঙ্কারার আনুষ্ঠানিক বক্তব্যগুলো ছিল খানিকটা বিস্ময় ও সতর্কতার মিশ্রণে। লড়াই শুরুর পরের দিনই তুর্কি কর্তৃপক্ষ জানায়, সিরিয়ায় কী ঘটছে তা তারা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং নিজেদের সেনাদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।
দুই দিন পর মিডল ইস্ট আই-কে এক জ্যেষ্ঠ তুর্কি নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, বিরোধী বাহিনীর এই অগ্রযাত্রার লক্ষ্য ছিল বেসামরিকদের ওপর আসাদ বাহিনীর হামলা থামানো এবং ২০১৯ সালের ইদলিব ডি-এস্কেলেশন জোনের সীমানা পুনর্দখল। তবে লড়াই সেখানে থেমে থাকেনি। বিভিন্ন গোষ্ঠী অগ্রসর হতে থাকে এবং নতুন নতুন শহর ও বসতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।
‘রদউল উদওয়ান’ অভিযানের তৃতীয় দিনে তুরস্ক-সমর্থিত ‘ন্যাশনাল আর্মি’ শুরু করে ‘ফা;জরুল হুররিয়া’ অভিযান। তাদের হামলায় টার্গেট ছিল সরকারি বাহিনী এবং এসডিএফ। এতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর, বিশেষ করে তেল রিফাত ও ম্যানবেজ তাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর এসডিএফ ও তুরস্ক উভয় পক্ষই একে অপরকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গের জন্য দোষারোপ করে।
‘রদউল উদওয়ান’–এর নিয়ন্ত্রিত এলাকা যত বিস্তৃত হতে থাকে, ততই আলোচনার টেবিলে নড়াচড়া বাড়ায় আঙ্কারা। মস্কো ও তেহরানের পাশাপাশি সিরিয়া ইস্যুতে জড়িত আরও কয়েক পক্ষের সঙ্গে তুরস্কের যোগাযোগ ও বৈঠক বাড়তে থাকে। তুর্কি অবস্থান কীভাবে ধাপে ধাপে বদলেছে—পরবর্তী বিবৃতিগুলোতেই তার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
২ ডিসেম্বর
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, সিরিয়ার ঘটনাবলিকে বিদেশি হস্তক্ষেপের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা ভুল হবে। তুরস্ক কোনো বাড়তি উত্তেজনা চায় না।
৩ ডিসেম্বর
প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপে অঞ্চলজুড়ে কূটনীতির জন্য বৃহত্তর সুযোগ রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে সিরীয় শাসনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়া জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি। এরদোয়ান একথাও জানান যে, তুরস্ক সিরিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও একটি ‘ন্যায়সংগত ও টেকসই সমাধান’-এর পক্ষে।
৫ ডিসেম্বর
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে আলাপে এরদোয়ান বলেন, ‘সিরিয়ান সংঘাত’ এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে এবং পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে ‘শান্তভাবে’ পরিচালিত হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সিরিয়া আর নতুন করে অস্থিতিশীলতার মুখে পড়বে না এবং বেসামরিক প্রাণহানি কমে আসবে।
৬ ডিসেম্বর
এরদোয়ান বলেন, ‘ইদলিব, হামা,হোমস এবং অবশ্যই শেষ টার্গেট দামেস্ক, এই প্রতিরোধ অভিযানের পথ চলা অব্যাহত। আমরা আশা করি, এই অভিযান সিরিয়ায় কোনো ঝামেলা বা দুর্ঘটনা ছাড়া চলতে থাকবে।’
৮ ডিসেম্বর
হাকান ফিদান বলেন, তুরস্ক সিরিয়ার জাতীয় ঐক্য, সার্বভৌমত্ব এবং ভূখণ্ডের অখণ্ডতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তুর্কি ও মার্কিন কর্মকর্তারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং তিনি প্রাসঙ্গিক সব পক্ষকে সতর্ক ও শান্তভাবে আচরণ করতে অনুরোধ করেন, যাতে অঞ্চলটি আরও অস্থিতিশীল না হয়।
১৫ ডিসেম্বর
হাকান ফিদান আরও বলেন, তুরস্ক ‘রদউল উদওয়ান’ অভিযানের পরিকল্পনার অংশ ছিল না এবং চেষ্টা করেছে রক্তপাত এড়িয়ে ‘হাইআত তাহরির আশ শাম’-এর শুরু করা কাজ শেষ করতে।
তিন ধাপের তুর্কি পদক্ষেপ
‘রদউল উদওয়ান’ অভিযান সামনে রেখে তুরস্কের বিবৃতি, যোগাযোগ ও কূটনৈতিক সক্রিয়তা ক্রমেই জোরালো হয়। তবে আঙ্কারা বারবার বলেছে, তারা এ অভিযানে নেই, পরিকল্পনাতেও জড়িত নয়। অন্যদিকে সিরিয়ার রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বেরও দাবি ছিল, সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে সিরিয়ার, আর এ লড়াইয়ের প্রস্তুতি স্থানীয় সক্ষমতার ভিত্তিতেই নেওয়া হয়েছে। যার সূচনা ২০২০ সালে, এবং পূর্ণতা পায় অভিযান শুরুর মুহূর্তে এসে।
আসাদ সরকারের পতনের পর দামেস্কে কূটনৈতিকভাবে প্রথম যে দেশ পৌঁছায়, তা হলো তুরস্ক। ১৩ বছর পর ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর দেশটির গোয়েন্দা প্রধান ইব্রাহিম কালিনের নেতৃত্বে একদল শীর্ষ কর্মকর্তা দামেস্ক সফর করেন। এর আগে ২০১১ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ দাউদ ওগলুর সফরই ছিল শেষ আনুষ্ঠানিক সফর।
‘ওমরান স্টাডিজ সেন্টার’-এর বিশ্লেষক ওসামা শেখ আলী বলেন, ‘রদউল উদওয়ান’ অভিযানের সিদ্ধান্ত ছিল পুরোপুরি সিরিয়ার নিজস্ব। বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর দ্রুত অগ্রগতি আর আলেপ্পোতে তাদের প্রবেশ যে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোকে বিস্মিত করেছে, তা থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট। তিনি আরও বলেন, পুরো অভিযানের সময় তুরস্কের অবস্থান তিনটি ধারাবাহিক ধাপ অতিক্রম করেছে।
প্রথম ধাপ
অভিযান শুরুর পর তুরস্কের অবস্থান ছিল সতর্ক ও অপেক্ষমান। আঙ্কারা খুব নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে। তাদের কূটনৈতিক বক্তব্যে জোর ছিল স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং সংঘাতকে বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়া থেকে আটকানো। একই সঙ্গে ‘আস্তানা প্রক্রিয়া’র ভারসাম্য নষ্ট না করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখা ছিল প্রধান বিবেচনা। নতুন করে শরণার্থীর ঢল নামার আশঙ্কাও তুরস্ককে সংযত রেখেছে।
দ্বিতীয় ধাপ
বিদ্রোহী বাহিনী আলেপ্পো দখল করে দক্ষিণ ইদলিব ও হামার দিকে অগ্রসর হলে তুরস্কের অবস্থানে পরিবর্তন আসে। আঙ্কারা তখন বিস্তৃত কূটনৈতিক তৎপরতায় নামে। আরব ও আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর সাথে যোগাযোগ চালায় করে, অভিযানের বিস্তার কোথায় গিয়ে ঠেকতে পারে তা খতিয়ে দেখে এবং সংঘাতের বিস্তৃতি ঠেকাতে সক্রিয় ভূমিকা নেয়। রাশিয়াসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করে দিয়ে তুরস্ক বার্তা আদান-প্রদান ও উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা চালায়।
তৃতীয় ধাপ
সরকার পতনের সম্ভাবনা ঘনিয়ে আসতেই তুরস্ক ঘটনাটিকে একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবে বিবেচনা করে। দামেস্কে উচ্চপর্যায়ের সফর এবং ‘হাইআত তাহরির আশ শাম’-এর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে আঙ্কারা সরাসরি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়। এতে সামরিক নেতৃত্বের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয় এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক শূন্যতার ঝুঁকিও অনেকটাই কমে আসে।
গবেষক ওসামা শেখ আলির মতে, ‘রদউল উদওয়ান’-এর সাফল্য নিশ্চিতে তুরস্কের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা শুধু অভিযানের সময়সীমা নিয়ন্ত্রণেই রাখেনি, বরং পুরো বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়া থেকে রক্ষা করেছে এবং বড় শক্তিগুলো, বিশেষ করে রাশিয়াকে দূরে রাখতে পেরেছে। এর ফলে অভিযানের ফলাফল নিয়ে এ অঞ্চলে এক ধরনের প্রাথমিক গ্রহণযোগ্যতাও তৈরি হয়।
এ ছাড়া তুরস্ক নতুন প্রশাসনের জন্য ভেতরে ভেতরে এক ধরনের প্রাথমিক বৈধতা গড়ে তুলতেও সহায়তা করেছে। তুরস্কে থাকা বিরোধী নেতাদের সঙ্গে মাঠের নেতৃত্বের যোগাযোগ সহজ করে তারা আসাদ-পরবর্তী সময়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও অস্থিরতার আশঙ্কা অনেকটাই কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।
কাতারের ইতিবাচক ভূমিকা
‘রদউল উদওয়ান’ অভিযানের সময় সিরিয়া সংকটকে ঘিরে নানা পক্ষের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ ও বৈঠকে কাতার ছিল বেশ সক্রিয়। বিশেষ করে কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আস সানির তুরস্ক, জর্ডান ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে দ্রুত বদলে যাওয়া পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা ছিল উল্লেখযোগ্য। শুরু থেকেই কাতারের অবস্থান ছিল স্পষ্ট, সিরিয়া সংকটের সমাধান অবশ্যই আন্তর্জাতিক বৈধতার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসতে হবে; যা পূরণ করবে সিরিয়ার মানুষের প্রত্যাশা এবং রক্ষা করবে দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা।
প্রতিরোধ যোদ্ধারা যখন সিরিয়ার রাজধানী দামেশক ঘিরে ফেলার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন সবার চেখ রাজধানী দোহার দিকে। সেখানেই ৭ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে ‘অস্তানা প্রক্রিয়া’-র তিন গ্যারান্টর তুরস্ক, রাশিয়া ও ইরান একটি বিশেষ বৈঠকে যোগ দেয়।
বৈঠকের বিবৃতি খুব সাধারণ অবস্থান হিসেবে কেবল, সিরিয়ার ঐক্য ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং উত্তেজনা কমানোর আহ্বান করা হলেও সেই মুহূর্তে এমন একটি বৈঠক আয়োজন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার শঙ্কা কিছুটা কমে আসে এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রেও অন্তত ন্যূনতম বাধাহীন পরিবেশ তৈরি হয়।
বিশেষ করে জটিল আলোচনার টেবিল সামলানো ও মধ্যস্থতায় কাতারের পরিচিত দক্ষতা, যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যকার আলোচনায় তাদের ভূমিকার মতো এ ক্ষেত্রেও কার্যকর হয়েছে।
কাতারের আমির তামিম বিন হামাদ আস সানির দামেস্ক সফর দুদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে ওঠে। আসাদে সরকারের পতনের পর তিনিই প্রথম আরব নেতা হিসেবে সিরিয়া সফর করেন। গত ১৪ বছরে সিরীয় জনগণের পক্ষে দোহার যে ভূমিকা ছিল, এই সফর তা আরও দৃঢ় করে।
‘জাসুর’ গবেষণা কেন্দ্রের বিশ্লেষক ওয়ায়েল আলওয়ান বলেন, ‘রদউল উদওয়ান’ অভিযান সম্পূর্ণভাবে সিরিয়ানদের সিদ্ধান্তে শুরু হয়েছিল। সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্তে আশংকা ছিল, ইদলিবের পরিণতিও গাজার মতো হতে পারে বা রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া ভয়াবহ হতে পারে। তবে ফ্রন্টের নেতৃত্ব ভেবেছে, ইতিহাসের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে; দীর্ঘদিনের ধ্বংসযজ্ঞের মাঝে আটকে থাকার সময় শেষ। পর্যবেক্ষণেও দেখা গেছে, ২০১৫ সালের পর যেসব শক্তির উপর নির্ভর ধরে আসাদ সরকার টিকে ছিল, তা এখন অনেকটাই দুর্বল।
অভিযান শুরু হতেই সবচেয়ে বড় চমক ছিল সরকারি বাহিনীর অস্বাভাবিক দ্রুত পতন। খুব অল্প সময়েই আলেপ্পো মুক্ত হয় এবং অগ্রযাত্রা অন্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে। এতে সবার মধ্যে নতুন আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়, ‘সিরিয়ার মুক্তি’ তাঁদের কাছে শুধু স্লোগান ছিল না; তাঁরা বিশ্বাস করতেন, আলেপ্পোর মুক্তি থেকেই বৃহত্তর পরিবর্তনের শুরু।
আলওয়ান আরও বলেন, এই পরিবর্তন শুধু সিরিয়ানদের জন্য নয়, পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোও দ্রুত উপলব্ধি করে যে, সিরিয়ার স্থিতিশীলতা বাশার আল আসাদের হাতে অর্পণ করা ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। বাশারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগের পরও সিরিয়া আরব বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ফিরে যেতে ব্যর্থ হয়েছে
আলওয়ান বলেন, অভিযান শুরুর পর তুরস্ক ও কাতারের সমন্বিত ভূমিকা ছিল স্পষ্ট ও প্রভাবশালী। প্রথম ধাপে তারা বিদ্রোহী পক্ষের অগ্রযাত্রায় সহায়তা দিয়েছে, পরের ধাপে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে সিরিয়ানদের সম্ভাব্য ক্ষতি কমানোর কাজ করেছে। বিশেষ করে রাশিয়াসহ পূর্বের মিত্রদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এ প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করেছে। তাঁর মতে, এই ইতিবাচক হস্তক্ষেপই বিদ্রোহীদের হোমস পৌঁছানোর পর পুরোনো শাসকের বিদায় নিশ্চিত করেছে এবং রক্তপাত ছাড়াই রাজধানী দামেস্ক ও আশপাশের এলাকা মুক্ত হওয়ার পথ খুলে দিয়েছে।











